ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১০ আশ্বিন ১৪২৬

পাবনায় মিন্টো ও এনিটিকে বাঙালি সাজিয়ে ভালোবাসার অনুষ্ঠান

https://www.jugantor.com/country-news/90437/পাবনায়-মিন্টো-ও-এনিটিকে-বাঙালি-সাজিয়ে-ভালোবাসার-অনুষ্ঠান
BY  পাবনা প্রতিনিধি ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ২১:৪৭ | অনলাইন সংস্করণ
ছবি: যুগান্তর শুক্রবার পর্যন্ত স্বজনদের কাউকে খুঁজে পাননি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডেনিশ নাগরিক মিন্টো কারস্টেন। তাই আপাতত ডেনমার্কে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

তবে পরে আবার সময় নিয়ে তিনি আসবেন স্বজনদের সন্ধানে। গত ৩ সপ্তাহ ধরে হারিয়ে যাওয়া বাবা-মার সন্ধানে স্ত্রীকে নিয়ে পাবনার পথে পথে ঘুরছেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ডেনিশ নাগরিক মিন্টো কারস্টেন সোনিক (৪৭)।

এদিকে স্বজনদের পাওয়া না গেলেও মিন্টো ও তার স্ত্রী এনিটিকে নিয়ে শুক্রবার পাবনা প্রেসক্লাবে এক ব্যতিক্রমী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

এ সময় মিন্টোকে পাঞ্জাবি, গামছা ও তার স্ত্রী এনিটিকে শাড়ি পড়িয়ে বাঙালি বর-কনের বেশে সাজানো হয়। দেয়া হয় সংবর্ধনা। পাবনার কয়েকজন তরুণ সাংবাদিক-সাংকৃতিক কর্মী 'আমরা পাবনাবাসী’র ব্যানারে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।

এ সময় মিন্টো বলেন, ডেনমার্কে আমার পালক বাবা-মা ও স্ত্রী সন্তানদের নিয়ে খুব সুখেই আছি, তবুও আমার অন্তর এখনো বারবার কেঁদে ওঠে বাংলাদেশের বাবা-মা ও স্বজনদের জন্য। মনে হয় স্বজনদের পেলে তার জীবনটা সম্পূর্ণ হয়ে উঠবে।

তিনি বলেন, স্বজনদের পাব কি-না জানি না, তবে এ মাটির সন্তান হিসেবে আপনাদের কাছ থেকে যে ভালোবাসা পেয়েছি তা কোনো দিন ভুলব না। আমি এ দেশের মানুষের (পাবনাবাসীর) ভালোবাসায় সিক্ত। আমি বারবার এখানে আসব।

মিন্টোর স্ত্রী বলেন, আমি অভিভূত এ দেশের মানুষের ভালোবাসা দেখে। তাদের সহযোগিতাসুলভ আচার অনেক দেশেই নেই। মিন্টোর সঙ্গে আমিও আবার আসব বলে উল্লেখ করেন এনিটি।

এ সময় বিশেষ অতিথি ছিলেন, পাবিপ্রবির উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. আনোয়ারুল ইসলাম, পাবনা প্রেসক্লাবের সিনিয়র সহসভাপতি আখতারুজ্জামান আখতার, পাবনা ব্যাপটিস্ট চার্চের যাজক ইসহাক সরকার।

ডেইলি স্টারের পাবনা প্রতিনিধি তপু আহমেদের সঞ্চালনায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন পাবিপ্রবির শিক্ষক সমিতির সভাপতি আওয়াল কবির জয়, পাবনা সিটি কলেজের অধ্যাপক ও সাংস্কৃতিক কর্মী শামসুন্নাহার বর্না, সাংবাদিক সৈকত আফরোজ আসাদ, মিন্টোর বাংলাদেশি বন্ধু স্বাধীন বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক কর্মী মাহবুবল হক লিটন, সাংবাদিক মাহবুব মোর্শদ বাবলা প্রমুখ।

অনুষ্ঠানে মিন্টোর জন্য ভালোবাসা শিরোনামে স্থানীয় শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন। এ সময় বাংলাদেশের বাউল সম্রাট শাহ আব্দুল করিমের ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম---গানের সঙ্গে তরুণদের নিয়ে নাচে অংশ নেন মিন্টো ও তার স্ত্রী এনিটি।

এ সময় পাবনা প্রেসক্লাবের ভিআইপি অডিটরিয়ামে এক অন্যরকম পরিবেশের সৃষ্টি হয়।

৪১ বছর আগে হারিয়ে যাওয়া বাংলাদশে স্বজনদের খুঁজতে এসে ডেনিশ নাগরিক মিন্টো জানান, ছয় বছর বয়সে হারিয়ে যান তিনি, জানেন না তার বাবা-মা এমনকি গ্রামের নাম। শুধু এটুকু মনে আছে তার-পাবনার নগরবাড়ি ঘাট থেকে সে হারিয়ে যান।

ছোটবেলার একটি ছবিকে সম্বল করে নিজের পরিবার ফিরে পেতে পাবনার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে বেড়াচ্ছেন তিনি। হারিয়ে যাওয়ার সময়কার তার ছবি দেখিয়ে জানতে চাইছেন কেউ এই ছেলেটিকে চেনেন কিনা ?

মিন্টোর বিলি করা লিফলেট থেকে জানা যায়, ১৯৭৭ সালে ছয় বছর বয়সে পাবনার নগড়বাড়ি ঘাটে হারিয়ে যান মিন্টো। সেখান থেকে চৌধুরী কামরুল হোসেন নামের এক ব্যক্তি মিন্টোকে পৌঁছে দেন ঢাকার এক আশ্রমে।

১৯৭৮ সালে ওলে ও বেনফি নামের ডেনিশ দম্পতি দত্তক নিয়ে ডেনমার্ক নিয়ে যান মিন্টোকে।

কিছুদিন আগে ফেসবুকের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন পাবনায় স্বাধীন বিশ্বাস নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। আত্মপরিচয় অনুসন্ধানে চলে আসেন বাংলাদেশের পাবনায়।

মিন্টো জানান, ছেলেবেলার কোনো স্মৃতিই মনে নেই তার। জানেন না বাংলা ভাষা। তবে, পেশায় চিত্রশিল্পী মিন্টোর গায়ের রং জানান দেয় তার বাঙালি পরিচয়।

মিন্টো জানান, পুরনো কাগজ ঘেঁটে জেনেছেন মাত্র ৬ বছর বয়সে পাবনার বেড়া উপজেলার নগরবাড়ি ঘাট এলাকা থেকে হারিয়ে যান তিনি। সেখান থেকে ঢাকার ঠাঁটারীবাজার টেরিডেস হোমস নামের শিশুসদনে ছিলেন।

পরে শিশুসদন থেকে ১৯৭৮ সালে ডেনমার্কের এক নিঃসন্তান দম্পতি মিন্টুকে দত্তক নিয়ে যায়। সেখানেই তার শৈশব-কৈশোর কাটে। বিত্তবৈভবের মাঝে লেখাপড়া শিখে বড় হন। পেশায় একজন চিত্রশিল্পী তিনি।

ডেনমার্কের নাগরিক এনিটি হোলমিহেভ নামের এক চিকিৎসককে বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেন। তাদের দাম্পত্য জীবনে এক ছেলে ও মেয়ে রয়েছে। এদিকে প্রায় প্রতিদিনই সন্তানের দাবি নিয়ে অনেকেই আসছেন মিন্টোকে দেখতে। কিন্ত বেশির ভাগ দাবিদারের বর্ণনার সঙ্গে মিল পড়ছে না। তবে কয়েকজনকে আমলে নেয়া হয়েছে ও পুলিশের সহায়তায় তাদের ডিএনএ টেস্ট করা হবে বলে জানান মিন্টোর বন্ধু স্বাধীন বিশ্বাস।

স্বাধীন বিশ্বাস আরও জানান, মিন্টোকে ১৯৭৭ সালে চৌধুরী কামরুল ইসলাম নামের যে ব্যক্তি উদ্ধার করে ঢাকায় হোমে পৌঁছে দেন তিনি এখন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। শীঘ্রই তিনি দেশে আসবেন এবং তিনি আসলে মিন্টোকেও আসতে বলা হবে। হয়তো এ সময় তার স্বজনদের পাওয়ার ব্যাপারে তিনি ভূমিকা রাখতে পারবেন।

পাবনার জেলা প্রশাসক জসিম উদ্দিন জানান, মিন্টোর বিষয়টি খুবই বেদনার। আমরা তাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করছি এবং ভবিষ্যতে প্রয়োজনে আরও সহযোগিতা করা হবে।

এদিকে স্বজনদের পাওয়া না যাওয়ায় আপাতত ডেনমার্কে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন মিন্টো ও তার স্ত্রী এনিটি। আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তারা এখানে থাকবেন।