ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

আসন ধরে রাখতে মরিয়া আ’লীগ বিএনপিতে কোন্দলই বড় বাধা

https://www.jugantor.com/todays-paper/last-page/38941/আসন-ধরে-রাখতে-মরিয়া-আলীগ-বিএনপিতে-কোন্দলই-বড়-বাধা
BY  আব্বাস আলী, নওগাঁ ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে নওগাঁ-৫ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থীদের তোড়জোড় চলছে। নির্বাচনী মাঠ গরম করার চেষ্টা করছেন বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা।

তৃণমূল নেতাকর্মীসহ ভোটারদের সঙ্গেও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন প্রার্থীরা। লবিং চলছে কেন্দ্রের সঙ্গেও। নিজেকে নানাভাবে তুলে ধরার চেষ্টায় মনোনয়ন প্রত্যাশীরা।

নানা দিবসে নিজেদের ছবি সংবলিত শুভেচ্ছা ব্যানার ও পোস্টার টানাতে ভুল করছেন না প্রার্থীরা। একটি পৌরসভা ও ১২টি ইউনিয়ন নিয়ে নওগাঁ সদর আসনে আওয়ামী লীগের তিনজন এবং বিএনপির প্রায় অর্ধডজন নেতা মনোনয়নের আশায় দৌড়ের ওপর আছেন।

প্রয়াত আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বাণিজ্যমন্ত্রী বর্ষীয়ান নেতা আবদুল জলিলের আসন হিসেবে পরিচিত এটি। ২০০১ এবং ২০০৮ সালের ভোটে এ আসন থেকে এমপি হন তিনি।

২০১৩ সালের ৬ মার্চ মৃত্যুর আগ পর্যন্ত জাতীয় সংসদে এ আসনের তিনি প্রতিনিধিত্ব করেন। তার মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে বিজয়ী হন জেলা আওয়ামী লীগের দীর্ঘদিনের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে তিনি জেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতি রফিকুল ইসলামকে হারিয়ে পুনরায় এমপি হন। আগামী নির্বাচনেও আবদুল মালেক আওয়ামী লীগের শক্তিশালী প্রার্থী।

তবে আবদুল জলিলের মৃত্যুর পর এ আসনে আওয়ামী লীগে বিভক্তি দেখা দেয়। যা আজও বিদ্যমান। এ আসনে বিএনপিরও একটা শক্ত অবস্থান রয়েছে।

বিশেষ করে নব্বইয়ের পট পরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের প্রথম নির্বাচনে বিজয়ী হন বিএনপির মো. শামসুদ্দিন আহমেদ। ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও তিনি বিজয়ী হন।

শাসক দল আওয়ামী লীগে মনোনয়ন দৌড়ে জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মালেক ছাড়াও রয়েছেন প্রয়াত নেতা আবদুল জলিলের ছেলে জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক এবং জেলার ইয়াং বাংলা অর্গানাইজার ব্যারিস্টার নিজাম উদ্দিন জলিল জন, নওগাঁ পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি দেওয়ান ছেকার আহমেদ শিষাণ।

নির্বাচনী ভাবনা নিয়ে কথা হয় বর্তমান এমপি আবদুুল মালেকের সঙ্গে। মনোনয়ন নিয়ে জানতে চাইলে তিনি যুগান্তরকে বলেন, কাকে মনোনয়ন দেয়া হবে সে বিষয়ে শেখ হাসিনাই ভালো জানেন।

মানুষের প্রত্যাশা থাকতেই পারে। আওয়ামী লীগ মনোনয়ন টিকিটের দোকান খুলে বসেনি। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে সরাসরি জেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্ব দিয়েছেন।

আমাকে সভাপতি যিনি করেছেন, টিকিটও তিনি দেবেন। কি বিবেচনায় তিনি টিকিট দেবেন, সেটা তার ব্যাপার। দলের সম্মানে যা করা দরকার করব।

১০ এপ্রিল শহরের ঠিকানা কমিনিউটি সেন্টারে নওগাঁয় পৌর আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় ঘোষণা দিয়ে মাঠে নেমেছেন, নওগাঁ পৌর আওয়ামী লীগ সভাপতি দেওয়ান ছেকার আহমেদ শিষাণ।

গত পৌর নির্বাচনে বিএনপির নজমুল হক সনির কাছে সামান্য ভোটে তিনি পরাজিত হন। বিভিন্ন সামাজিক কাজে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন তিনি।

কথা হয় ছেকার আহমেদ শিষাণের সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, সদরে অনেক অবহেলিত এলাকা রয়েছে। শেখ হাসিনা যে গতিতে দেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে নিয়ে গেছেন নওগাঁ সদর সে অবস্থানে নেই। পৌর আওয়ামী লীগকে বারবার আঘাত করা হচ্ছে।

আমরা আবদুল মালেককে উপজেলা চেয়ারম্যান ও এমপি বানিয়েছি। অথচ পৌরসভায় আমাকে কে হারিয়েছেন তা আমি জানি। আমাদের শত্রু আমরাই।

এলজিইডি প্রকৌশলীকে দিয়ে আমার নামে মামলা করা হয়েছে। তৃণমূল আমাকে চাইছে। মনোনয়ন দিলে নির্বাচন করব। বিজয়ী হতে পারলে নওগাঁ শহরকে মডেল হিসেবে সাজাব।

কথা হয় নওগাঁ পৌর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, বর্তমান এমপি কর্মীদের মূল্যায়ন করেন না।

তৃনমূল নেতাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চান না। মনে হয় আমরা তার কর্মচারী। দলের মধ্যে তিনিই ভাঙন সৃষ্টি করেছেন।

প্রয়াত নেতা আবদুল জলিলের ছেলে ব্যারিস্টার নিজাম উদ্দিন জলিল বয়সে তরুণ এবং রাজনীতিতেও নবীন। ২০১৫ সালে তিনি ব্যারিস্টারি পড়া শেষ করেছেন।

জানতে চাইলে নিজাম উদ্দিন জলিল জন বলেন, আমি রাজনৈতিক পরিবারের সন্তান। বাবা সারা জীবন মানুষের কল্যাণে কাজ করে গেছেন।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে ব্যারিস্টারি পড়া অসমাপ্ত রেখে বিদেশের মায়া ত্যাগ করে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। তিনি নওগাঁবাসীর জন্য অনেক উন্নয়ন করেছেন। অনেক কাজ অসমাপ্ত।

জননেত্রী শেখ হাসিনা আমাকে মনোনয়ন দিলে বিজয়ী হয়ে বাবার অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করব। মনোনয়নের ব্যাপারে আশাবাদী। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে নওগাঁর উন্নয়নে মনোনিবেশ করব আগামীতে।

নানামুখী চাপের মুখেও জেলা বিএনপিতে চরম কোন্দল চলছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দলের ভেতর গ্র“পিং অনেকটাই দৃশ্যমান।

এতসব প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেও নওগাঁ সদর উপজেলা ও নওগাঁ পৌরসভা বিএনপির দখলে। এখন পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ জেলা কমিটি হয়নি।

কেন্দ্র থেকে ৩০ সদস্যের কমিটি করে দেয়া হলেও এরই মধ্যে তিনজনকে বহিষ্কার করা হয়েছে। তবে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার পর থেকে হাইকমান্ডের সিদ্ধান্তে বিএনপি নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ, সমাবেশ, পথসভা ও লিফলেট বিতরণ করছেন।

তবে নির্বাচন সামনে রেখে দলের একাধিক নেতা মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীরা হচ্ছেন- বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা লে. কর্নেল (অব.) আবদুুল লতিফ খান, জেলা বিএনপির সভাপতি নওগাঁ পৌর মেয়র নজমুল হক সনি, জেলা বিএনপির সহসভাপতি ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের জেলা আহ্বায়ক সাবেক এমপি রায়হান আক্তার রনি, জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম ধলু, জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপন। তবে নজমুল হক সনি ও জাহিদুল ইসলাম ধলু সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।

মনোনয়ন নিয়ে কথা হয় নওগাঁ পৌরসভার টানা দুই বারের মেয়র নজমুল হক সনির সঙ্গে। তিনি যুগান্তরকে বলেন, যারা রাজনীতি করেন তাদের প্রত্যেকেরই একটা টার্গেট থাকে, আর সেটি হচ্ছে সংসদ নির্বাচন করা। দলীয় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচিত হলে আমার প্রথম কাজ হবে নওগাঁয় গ্যাস নিয়ে আসা।

যানজট কমাতে শহরের লিটন ব্রিজকে একমুখী করে নতুন আরও একটি ব্রিজ নির্মাণ করা। এছাড়া নওগাঁ কৃষিপ্রধান এলাকা।

কৃষিতে উন্নয়ন ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা। শহরের বাইপাস শালুকা থেকে তালতলী, বলিহার ও খিদিরপুর হয়ে জেলার রানীনগর পর্যন্ত বাইপাস সড়ক নির্মাণ করা।

তবে শেষ পর্যন্ত যাকেই মনোনয়ন দেয়া হোক না কেন, আমি তার পক্ষেই মাঠে কাজ করব।

অনেক ত্যাগ স্বীকারের পর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান জাহিদুল ইসলাম ধলু। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে মাঠে নেমে পড়েছেন তিনি।

স্থানীয়ভাবে সভা-সেমিনারে যোগদানসহ লিফলেট বিতরণ, কর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছেন। নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডেও নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন।

মনোনয়নের ব্যাপারে কেন্দ্রের সবুজ সংকেত পাওয়ার কথা স্বীকার করে জাহিদুল ইসলাম ধলু বলেন, আমি তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত আছি।

নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে কাজ করলে আসনটি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। তিনি বলেন, আমাকে ৪ মাস আগে চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে ডেকে নেয়া হয়।

সেখানে নওগাঁর এবং কেন্দ্রীয় কয়েকজন নেতাও উপস্থিত ছিলেন। ম্যাডাম নওগাঁ-৫ থেকে আমাকে মনোনয়ন দেয়ার কথা বলেছেন। সেই লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছি। মনোনয়ন পেলে বিজয়ী হব।

ছাত্রজীবন থেকে বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মামুনুর রহমান রিপন বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে শতাধিক ছাত্রনেতাকে মনোনয়ন দেয়া হবে।

এর মধ্যে আমারও একটা ভালো অবস্থান আছে। আশা করছি মনোনয়ন পেলে নির্বাচিত হবো।

এছাড়াও নওগাঁ জেলা জাতীয় পার্টির সাধারণ সম্পাদক ইফতারুল ইসলাম বকুল, জাসদের (ইনু) পক্ষ থেকে জেলা জাসদের সাংগঠনিক সম্পাদক সাংবাদিক আজাদ হোসেন মুরাদ মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।