ঢাকা, সোমবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৮, ৭ ফাল্গুন ১৪২৫
BYউজ্জ্বল মেহেদী, সিলেট
২৩ জানুয়ারি ২০১৮, ১৩:১৬

♦ সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় শাহ আরেফিন টিলা। টিলায় এক বছরে ১৯ বার ধস। ১৮ শ্রমিকের মৃত্যু। প্রাণহানির ঘটনায় নয়টি হত্যা মামলা।

টিলার পুরোটাই সাবাড়। আছে শুধু স্তূপাকৃতির ধ্বংসাবশেষ। খাড়া ঢালের মতো একাংশে চার-পাঁচজন শ্রমিক। কোমরে দড়ির প্যাঁচ দিয়ে ঢালে দাঁড়িয়ে শাবল হাতে চলছিল খোঁড়াখুঁড়ি। কাঠঠোকরা পাখি যেমন গাছের গায়ে বসে ঠোকর দেয়, ঠিক তেমনি দেখাচ্ছিল তাঁদের। এর নিচে বিরাটকায় গর্ত। ধস বা পা পিছলে পড়লেই নির্ঘাত মৃত্যু!গত রোববার দুপুরে এ রকম মৃত্যুঝুঁকির চিত্র দেখা গেল সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সীমান্তবর্তী শাহ আরেফিন টিলায়। টিলা কেটে পাথর উত্তোলন করছিলেন পাথরশ্রমিকেরা।এক বছর আগে ২৩ জানুয়ারি এ টিলার ঢালে বসে পাথর তোলার কাজ করতে গিয়ে টিলাধসে একসঙ্গে ছয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়। ওই দিন সরেজমিনে দেখা চিত্র আর এক বছর পরের চিত্র একই রকম। এই এক বছরে ১৯টি ধসের ঘটনা ঘটেছে এ টিলায়। গত শনিবার ও গতকাল সোমবার আরও দুজন মারা গেছেন। সব মিলিয়ে এই এক টিলাতেই এক বছরে ১৮ জনের প্রাণহানি ঘটেছে।|এসব প্রাণহানির ঘটনায় হত্যা মামলা হয়েছে নয়টি। গত এক বছরে পরিবেশ অধিদপ্তরকে নিয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন টাস্কফোর্সের অভিযান চালিয়েছে ২৫ বার। কিন্তু টিলা কেটে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন বন্ধ হয়নি। টিলার ধ্বংসলীলায় চলছে নিরীহ শ্রমিক হত্যাযজ্ঞ।টিলার খতিয়ানসরকারি খাস খতিয়ানের ১৩৭ দশমিক ৫০ একর জায়গায় শাহ আরেফিন টিলা। কথিত আছে, প্রায় ৭০০ বছর আগে হজরত শাহজালাল (রহ.)-এর অন্যতম সফরসঙ্গী হজরত শাহ আরেফিন (রহ.) খাসিয়া পাহাড় এলাকা পরিভ্রমণকালে পাহাড়-টিলার চূড়ায় বিশ্রাম নিতেন। শাহ আরেফিনের একটি ‘আসন’ (বিশ্রামের স্থান) হিসেবে পরিচিতি থেকে ওই টিলার নামকরণ হয়েছে শাহ আরেফিন টিলা। লালচে, বাদামি ও আঠালো মাটির এ টিলার নিচে রয়েছে বড় বড় পাথরখণ্ড। এসব পাথর উত্তোলন করতেই চলে টিলা কাটা।বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) একটি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই টিলার কিছু জমি খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বন্দোবস্ত এনে প্রভাবশালী পাথর ব্যবসায়ীদের একটি চক্র ২০০৯ সাল থেকে টিলা কেটে পাথর উত্তোলন করছিল। পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বেলা একটি কমিটির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণও করে। ৯৬ দশমিক ২৫ একর জায়গার ৭০ ভাগ টিলা কেটে ৬২ লাখ ৮৮ হাজার ঘনফুট পাথর লুটপাটের তথ্য সংগ্রহ করে এ কমিটি।

একের পর এক প্রাণহানি

২০০৯ সাল থেকে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন হলেও হতাহতের প্রথম ঘটনা ঘটে ২০১৭ সালের ২৩ জানুয়ারি। শাহ আরেফিন টিলায় সর্বশেষ গত শনিবার সাদিক মিয়া ও গতকাল সকালে ফারুক মিয়া নামের দুজন পাথরশ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। একসঙ্গে ছয়জন শ্রমিক মারা গেলে তাঁদের লাশ গোপনে দাফনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। খবর পেয়ে পুলিশ লাশগুলো উদ্ধার করে। ছয়জনের প্রাণহানির ঘটনায় হত্যা মামলা করা হয়। এরপর একের পর এক ধস ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটে গত বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত। এর মধ্যে ১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি, ২ মার্চ, ২৭ মে আরও চারটি ধসে নয়জনের প্রাণহানি ঘটলে কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও থেকে শুরু করে থানা-পুলিশে ব্যাপক রদবদল করা হয়। পরে ২০ জুলাই ও ২৬ অক্টোবর পাঁচজন মারা যাওয়ার পর উপজেলা প্রশাসন শাহ আরেফিন টিলায় পাথরবাহী ট্রাক চলাচল বন্ধ করে দেয়। প্রশাসনিক রদবদলের পর কোম্পানীগঞ্জের ইউএনও মুহাম্মদ আবুল লাইছ জানান, পাথর কোয়ারি ব্যতীত অন্য কোনো স্থানে পাথর উত্তোলন নিষিদ্ধ।

সরেজমিন, এক বছর আগে ও পরে

শাহ আরেফিন টিলায় যাতায়াতের একটিই রাস্তা। কাঁচা রাস্তাটি পাথরবাহী ট্রাক চলাচলে আরও নাজুক। কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ছয় কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে টিলাটি। গত বছরের ২৩ জানুয়ারি একসঙ্গে ছয়জন শ্রমিক মারা যাওয়ার দুদিন পর সরেজমিনে দেখা গিয়েছিল, ক্ষতবিক্ষত টিলা। কাটা অংশের পাশেই আছে সুবিশাল গর্ত। টিলা কাটা মাটি ধসে এসব গর্তে পড়ে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের ২৫ জানুয়ারি টিলা এলাকায় প্রবেশমুখে একটি বাড়ি দেখা গিয়েছিল। টিনের চালার এ বাড়ির চারদিক ছিল টিলা কাটা মাটির স্তূপ। গত রোববার ওই বাড়ির একটি কক্ষ একখণ্ড কাটা টিলার ওপর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। বাড়ির মালিকের খোঁজ করতে গিয়ে দুজন শ্রমিক জানালেন, ভাড়া দিয়ে মালিক চলে গেছেন। টিলা না কাটলেও বাড়িটি যেকোনো সময় ধসে পড়তে পারে—এমন আশঙ্কা বসবাসরত শ্রমিকদের। গত বছর এমন দিনে টিলা কেটে সমতল অংশে তাঁবু খাটিয়ে শ্রমিকদের অস্থায়ীভাবে বসবাস করতে দেখা গিয়েছিল। তাঁবুর বাসিন্দা শ্রমিকেরা তাঁদের কাজকে ‘গর্তশ্রম’ বলেন। আর নিজেরা ‘গর্তশ্রমিক’ বলে জানান। শ্রমিকের সংখ্যা তখন প্রায় ২৫ হাজার হলেও গত রোববার শ্রমিকেরা জানিয়েছেন, তাঁদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমে গেছে।

৪৭ ‘পাথরখেকো’ অধরা

অভিযোগ আছে, শাহ আরেফিন টিলা এলাকার পাশের কিছু জমি খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় থেকে বন্দোবস্ত এনে পাথর ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী ইজারা দেওয়ায় টিলা কেটে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন হচ্ছে। ২০০৯ সালে বেলার প্রতিবেদনে মোহাম্মদ আলীর নাম রয়েছে। মোহাম্মদ আলীর দাবি, তিনি টিলা এলাকা নয়, টিলার সমতল অংশ বন্দোবস্ত নিয়েছেন। টিলা কেটে পাথর উত্তোলনে জড়িত নন তিনি। শ্রমিক নিযুক্ত করে অবৈধ পাথর উত্তোলন করার অভিযোগ স্থানীয় পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম আহমদের বাবা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল বাছিরের বিরুদ্ধে। গত বছরের ২৩ জানুয়ারি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এ কমিটি শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনায় প্রশাসন ও পুলিশের গাফিলতি রয়েছে বলে উল্লেখ করে প্রতিবেদন দেয়। প্রতিবেদনে টিলা কাটার জন্য ৪৭ ‘পাথরখেকো’কে চিহ্নিত করা হয়।