ঢাকা, শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮, ৮ বৈশাখ ১৪২৫
BYএ কে এম ফয়সাল, পিরোজপুর
১৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৩:৪৬
• উপজেলা চেয়ারম্যানের সঙ্গে মেয়রের বিরোধ• দুই বছরে দুজন নিহত, আহত দুই শতাধিক, পঙ্গু ২• এবার মেয়রের অনুসারীকে কুপিয়ে হত্যা

পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলায় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে প্রায়ই সংঘর্ষ ঘটছে। গত দুই বছরে অর্ধশতাধিক সংঘর্ষে দুজন নিহতসহ দুই শতাধিক নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন। পঙ্গু হয়েছেন ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) দুজন সদস্য।

সর্বশেষ গত রোববার উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও পৌর মেয়র রফিউদ্দিন আহমেদের অনুসারী আবদুল লতিফ হাওলাদারকে (৫০) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। তিনি মঠবাড়িয়া উপজেলা সদর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক সদস্য। তাঁর বাড়ি বকসির ঘটিচোরা গ্রামে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও দলীয় সূত্রে জানা যায়, আধিপত্য বিস্তারের জের ধরে মেয়র এবং উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আশরাফুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। এ নিয়ে দুই নেতার অনুসারীরা কয়েকবার সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। রোববার একটি মামলায় পিরোজপুরের আদালতে হাজিরা দিতে যাচ্ছিলেন লতিফ। সকালে তুলাতলায় পৌঁছালে ভাতিজা আল আমিনসহ কয়েকজন তাঁকে কুপিয়ে হত্যা করেন।

উপজেলা যুবলীগের সভাপতি শাকিল আহমেদ বলেন, লতিফ মেয়রের ফুফাতো ভাই ও অনুসারী। আধিপত্য বিস্তার নিয়ে ভাতিজা আল আমিনের (২০) সঙ্গে লতিফের শত্রুতা রয়েছে। আল আমিন উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুসারী।

এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আল আমিনের মুঠোফোনে ফোন করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে মঠবাড়িয়া থানার ওসি গোলাম ছরোয়ার বলেন, এ ঘটনায় আল আমিনসহ কয়েকজনের জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এজাহার পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে ২২ মার্চ উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রাকিবুল ইসলামকে (২৯) কুপিয়ে জখম করে দুর্বৃত্তরা। রাকিবুল বলেন, ‘উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুর রহমানের নির্দেশে তাঁর বড় ভাই রিয়াজ উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে হত্যার উদ্দেশ্যে আমাকে কোপানো হয়েছে।’

জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আওয়ামী লীগের এই দুই নেতার দ্বন্দ্বে দুজন ইউপি সদস্যসহ দলের ১০ জন নেতা-কর্মী পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। এভাবে চলতে থাকলে দল ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এ অবস্থা বন্ধের জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে হস্তক্ষেপ চাইব।’

দলীয়, স্থানীয় লোকজন ও বিভিন্ন সময়ে আহত ২৭ জনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০১৬ সালের ২ জুলাই সরকারিভাবে খাদ্যশস্য কেনাকে কেন্দ্র করে রফিউদ্দিনের অনুসারী উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি নজরুল ইসলামের সঙ্গে আশরাফের অনুসারী উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আরিফুর রহমান ও পৌর ছাত্রলীগের সভাপতি শরিফুল ইসলামের লোকজন সংঘর্ষে জড়ান। এতে পাঁচজন নেতা-কর্মী আহত হন। একই বছরের ২৫ জুলাই আধিপত্য নিয়ে বিরোধের জের ধরে দুই পক্ষের সংঘর্ষের সময় গুলিতে আশরাফুরের অনুসারী যুবলীগের কর্মী লিটন পণ্ডিত নিহত হন। এ ঘটনায় রফিউদ্দিনকে প্রধান আসামি করে মামলা করেন লিটনের ভাই জাকির হোসেন পণ্ডিত। ২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি রফিউদ্দিনের অনুসারী বড়মাছুয়া ইউপির সদস্য কাইউম হোসেনকে কুপিয়ে জখম করে প্রতিপক্ষ। একই বছরের ৩০ নভেম্বর রফিউদ্দিনের অনুসারী টিকিকাটা ইউপির সদস্য ইসমাইল হোসেন ও দুবাইফেরত মহিবুল্লাহকে কুপিয়ে জখম করা হয়। ইসমাইল এখন পঙ্গু। ২৬ ডিসেম্বর রফিউদ্দিনের অনুসারী ধানীসাফা ইউপির সদস্য ইদ্রিস তালুকদারকে হাতুড়িপেটা করে প্রতিপক্ষ। এ ঘটনায় ইদ্রিসের দুই পা কেটে ফেলতে হয়। গত ২ জানুয়ারি মঠবাড়িয়া হাতেম আলী বালিকা বিদ্যালয়ের মাঠে স্বেচ্ছাসেবক লীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি মোল্লা আবু কাওসারসহ জ্যেষ্ঠ নেতাদের উপস্থিতিতে রফিউদ্দিন ও আশরাফের সমর্থকেরা সংঘর্ষে জড়ান। এতে অন্তত ২০ জন আহত হন। ১৬ মার্চ রফিউদ্দিনের অনুসারী মিরুখালী ইউনিয়ন ছাত্রলীগের সভাপতি লাভলু তালুকদারকে কুপিয়ে জখম করে প্রতিপক্ষরা।

পঙ্গু হয়ে যাওয়া ইদ্রিস তালুকদার বলেন, ‘সারা জীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতি করে এসেছি। অথচ উপজেলা চেয়ারম্যানের ভাই রিয়াজ উদ্দিনের মদদে সন্ত্রাসীরা হাতুড়িপেটায় পঙ্গু করে দিয়েছে। দল করে প্রতিদান পেলাম পঙ্গু-জীবন।’

জানতে চাইলে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি রফিউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর লোকজন আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশ করেছেন। এই লোকগুলো ও কিছু সন্ত্রাসী উপজেলা চেয়ারম্যানের ছত্রচ্ছায়ায় হামলা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটাচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান আশরাফুর রহমান বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ ঠিক নয়।