ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৭
BYমেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান
২৩ এপ্রিল ২০১৯, ১০:৪৯

শ্রীলঙ্কায় রোববার যে হামলা হয়েছে, এটা সম্প্রতিকালে বৈশ্বিক আঙ্গিকে সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। আটটি স্থানে সমন্বিতভাবে আক্রমণ করা হয়েছে। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো আন্তর্জাতিক বা শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ কোনো গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেনি। তবে বিভিন্ন তথ্য থেকে ধারণা করা যাচ্ছে, এটা খুব সম্ভবত কোনো ধর্মভিত্তিক দলের দ্বারা সংঘটিত হয়েছে। কারা করেছে, এটা এখন পর্যন্ত পরিষ্কার নয়।কদিন আগে আমরা নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে একটি মসজিদে মুসল্লিদের ওপর হামলা দেখেছি। সেখানেও অনেক প্রাণহানি হয়েছে। আমরা দেখতে পাচ্ছি, উগ্রপন্থী ধর্মীয় গোষ্ঠীগুলোর যে মতবাদ, সেটা এখন পর্যন্ত অটুট আছে। তারা সেটাকে বিস্তৃত করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছে।

শ্রীলঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের জন্যও কিছু শিক্ষণীয় রয়েছে। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গত এক দশকে এ ধরনের কোনো হামলা হয়নি, যার কারণে শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার যে ব্যবস্থাগুলো, সেটা অনেক ক্ষেত্রে বেশ শিথিল হয়ে পড়েছিল। বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যাচ্ছে, তারা একটা আগাম সতর্কবার্তা পেয়েছিল যে সেখানে আক্রমণ হতে পারে। কিন্তু এরপর যে ধরনের সতর্কতার প্রয়োজন থাকার দরকার, সে ক্ষেত্রে ঘাটতি ছিল। আগাম তথ্য তারা কাজে লাগাতে পারেনি। এটা না পারার একটা বড় কারণ সমন্বয়হীনতা। সরকারের একটি অংশের কাছে তথ্য ছিল। সেটা সরকারের অন্য অংশগুলো বা আইন প্রয়োগকারী বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে সম্মিলিতভাবে তারা কাজে লাগাতে পারেনি। এখানে গোয়েন্দা ব্যর্থতার পাশাপাশি সমন্বয়হীনতাও আছে। শ্রীলঙ্কায় ইস্টার সানডে কেবল ধর্মীয় নয়, এটা সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়। সব ধর্মের লোকজন এতে অংশগ্রহণ করেন। এমন বড় অনুষ্ঠানে যে ধরনের সতর্কতা রাখার প্রয়োজন, সেটা ছিল না।

বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে যেটা বলতে চাচ্ছি, হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর গত দু–তিন বছরে এখানে বড় ধরনের কোনো সন্ত্রাসী হামলা হয়নি। যার কারণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা সংস্থার মধ্যে একধরনের আত্মতুষ্টি লক্ষ করা যাচ্ছে। এ ধরনের মনোভাব নাজুক পরিস্থিতি তৈরি করে। সন্ত্রাসীরা সেটাকে সুযোগ হিসেবে নেয়। শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রেও এটা দেখা গেছে। গৃহযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তারা ভেবেছিল, আর কিছু হবে না। বাংলাদেশেও হোলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার পর নাগরিকদের মধ্যে যে সতর্কতা বা সজাগ দৃষ্টি দেখা গিয়েছিল, এখন সে ক্ষেত্রে শিথিলতা এসেছে। সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখার জন্য নতুন করে উদ্যোগ নেওয়া উচিত।

একই সঙ্গে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিজেদের ভেতরও আবার যাচাই করে দেখা দরকার, সমন্বয় করার বন্দোবস্তগুলো ঠিকভাবে কাজ করছে কি না। যেসব গোয়েন্দা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, সেটা অভ্যন্তরীণভাবে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও বাহিনীর পাশাপাশি বিদেশি যেসব দেশ বা সংস্থার সঙ্গে আমাদের সহযোগিতার ক্ষেত্র আছে, তাদের সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদান করতে হবে।

শ্রীলঙ্কার ঘটনার সঙ্গে কোনো আঞ্চলিক যোগাযোগ বা সহযোগিতা আছে কি না, সেটাও খতিয়ে দেখতে হবে। এ বিষয়ে আমাদেরও সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, এ ধরনের ঘটনায় দেশের বাইরে থেকেও সাহায্য থাকতে পারে।

এখন বৈশ্বিকভাবে আন্তর্জাতিক কিছু সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠী বড় ধরনের চাপের মধ্যে আছে। তারা চেষ্টা করবে বিভিন্ন দেশে সহজ লক্ষ্যবস্তু বা সফট টার্গেটগুলোকে খুঁজে বের করার। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চও একটা সফট টার্গেট ছিল। শ্রীলঙ্কাও কিছুটা সফট টার্গেট ছিল। কাজেই এ ধরনের সফট টার্গেট যেখানে আছে, নতুন করে সবকিছু যাচাই–বাছাই করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে।

নিউজিল্যান্ডে হামলার পর পরিস্থিতি বিশ্লেষণে আমরা মনে করেছি যে প্রতিশোধমূলক আক্রমণের একটা প্রবণতা থাকবে। আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীও তাদের অনুসারীদের যে যেখানে আছে, সেখান থেকে প্রতিশোধ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে। প্রতিশোধমূলক কোনো কর্মকাণ্ড যাতে না হয়, সে ব্যাপারে বাংলাদেশকেও সজাগ থাকতে হবে। শ্রীলঙ্কার হামলা প্রতিশোধমূলক হওয়ার ব্যাখ্যা যুক্তিযুক্ত বলে মনে হচ্ছে। কারণ, এক বছর আগে সে দেশে বৌদ্ধ ও মুসলিমদের মধ্যে দাঙ্গা হয়েছিল। এটা সেখানে কোনো প্রতিশোধমূলক প্রবণতা তৈরি করেছে কি না, সে বিষয়টিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এই অবস্থায় আমাদের দেশেও সবকিছু যাচাই–বাছাই করে দেখা উচিত, কোনো জায়গায় শিথিলতা বা দুর্বলতা আছে কি না। আমাদের দেশের তারকাবিশিষ্ট হোটেলগুলো সম্পূর্ণ সুরক্ষিত আছে বলে আমার মনে হয় না। যে ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা আছে সেটা অপ্রতুল। এ ব্যাপারে এবং সন্ত্রাসবাদীদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হতে পারে, এমন সব বিষয়ে নতুন করে দৃষ্টি দেওয়ার প্রয়োজন আছে। আমাদের বিমানবন্দরগুলোও নাজুক জায়গা, সেখানেও নতুন করে সমীক্ষা করে দেখতে হবে, কোনো ধরনের নিরাপত্তার ঘাটতি আছে কি না। থাকলে সেটা পূরণ করতে হবে। গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, সমন্বয় ও সতর্কতায় শিথিলতা আনা যাবে না।

মেজর জেনারেল (অব.) এ এন এম মুনিরুজ্জামান: প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ