ঢাকা, সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

জালিয়াতির তথ্য গোপন করে সুবিধা নিচ্ছে ব্যাংকগুলো

http://dainikamadershomoy.com/economy/132703/জালিয়াতির-তথ্য-গোপন-করে-সুবিধা-নিচ্ছে-ব্যাংকগুলো
BY  হারুন-অর-রশিদ ০৬ এপ্রিল ২০১৮, ০০:০০ | আপডেট : ০৬ এপ্রিল ২০১৮, ১০:২১ | অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে অনিয়ম ও জালিয়াতির তথ্য গোপন করে বিভিন্ন সুবিধা হাতিয়ে নিচ্ছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। অন্য বিভাগ জালিয়াতির তথ্য উদ্ঘাটন করলেও সুবিধাদানকারী বিভাগ তা জানতেও পারছে না। এভাবে বিপুল অঙ্কের ঋণ কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত গ্রাহকদের পক্ষে সুবিধা বাগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তাই এখন থেকে সুবিধা নেওয়ার জন্য আবেদনের সঙ্গে ওই ঋণসংক্রান্ত অন্য বিভাগের কোনো ধরনের নির্দেশনা থাকলে তা আবেদনপত্রের সঙ্গে সংযুক্তর করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এ বিষয়ের চিঠি সব ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের (এমডি) কাছে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সূত্র জানায়, ব্যাংকিং খাতের জালিয়াতি, অনিয়ম ও দুর্নীতি উদ্ঘাটন ও তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংকের অফসাইট ও অনসাইট একাধিক পরিদর্শন বিভাগ রয়েছে। ব্যাংকগুলোর দুর্নীতি সরেজমিনে পরিদর্শনে ব্যাংক পরিদর্শন বিভাগ (ডিবিআই-১), ডিবিআই-২, ডিবিআই-৩, ডিবিআই-৪, ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি অ্যান্ড কাস্টমার সার্ভিসেস বিভাগ (এফআইসিএসডি), বৈদেশিক মুদ্রা পরিদর্শন বিভাগ ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন বিভাগ রয়েছে। এ ছাড়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে পরিদর্শন কার্যক্রম চালায় অফসাইট সুপারিভিশন বিভাগ।

ব্যাংকগুলোর দৈনন্দিন কর্মকা- পরিচালনায় নীতিগত সহায়তা ও অনুমোদন দিতে রয়েছে একাধিক নীতি বিভাগ। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ (বিআরপিডি), বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ, মুদ্রানীতি বিভাগ (এমপিডি) ইত্যাদি। ঋণসংক্রান্ত নীতিগত ছাড় সুবিধা নিতে হলে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে সাধারণত বিআরপিডি থেকে অনুমোদন নিতে হয়। জালিয়াতি ও দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কোনো গ্রাহককে কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়া হয় না। কিন্তু ব্যাংকগুলো পরিদর্শন বিভাগের তথ্য গোপন করে বিআরপিডি বিভাগ থেকে সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন নির্দেশনা গোপন করে নির্দেশনার বিপরীতে কাজ করেছে কয়েকটি ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ইউনিল্যান্স গ্রুপকে দেওয়া ইসলামী ব্যাংকের ৩৩০ কোটি টাকার ঋণে অনিয়ম পায় বাংলাদেশ ব্যাংকের এফআইসিএসডি বিভাগ। ওই ঋণকে গত ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরত আনা অথবা ফেরত আনতে ব্যর্থ হলে তা মন্দমানে (বিএল) খেলাপি করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই নির্দেশনা পরিপালন না করে এবং নির্দেশনা গোপন করে বিআরপিডি থেকে ওই ঋণ ৫ বছরের জন্য পুনঃতফসিল করে নেয় ইসলামী ব্যাংক। আগের জালিয়াতির বিষয়টি জানার পর ২৯ মার্চ ওই পুনঃতফসিল সুবিধা বাতিল করে দিয়েছে বিআরপিডি। এ ছাড়া একই ধরনের অপরাধ বিভিন্ন সময়ে করে যাচ্ছে ব্যাংকগুলো।

ইসলামী ব্যাংকের সুবিধা বাতিলের পর সব ব্যাংককে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত রবিবার ব্যাংকগুলোয় পাঠানো চিঠিতে বলা হয়, ঋণের পুনর্গঠন, পুনঃতফসিল, সুদ মওকুফ, অবলোপন বা অন্য কোনো ধরনের ছাড় সুবিধা নিতে হলে আবেদনপত্রের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্য কোনো বিভাগের আপত্তি বা নির্দেশনা থাকলেও তা আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট ঋণের জন্য কোনো ধরনের জরিমানা বা শাস্তির সম্মুখীন হলে সেই তথ্যও সংযুক্ত করতে হবে। নির্দেশনা পাওয়া পর কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে, তা-ও জানাতে হবে। এর ব্যত্যয় ঘটলে সুবিধা দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাৎক্ষণিকভাবে বাতিল করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক (ইডি) পর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, আগেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এতে শৃঙ্খলা নষ্ট হয়। অনিয়মের দায়ে যাদের শাস্তি পাওয়ার কথা তারা সুবিধা বাগিয়ে নিচ্ছেন। এটি অনৈতিক। এ জন্য এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বড় বড় গ্রাহককে বিপুল অঙ্কের ঋণ সুবিধা দেওয়ার ক্ষেত্রে বিভিন্ন সময় কৌশলের আশ্রয় নিয়ে তথ্য গোপন করে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো। সরকারি মালিকানাধীন জনতা ব্যাংক এননটেক্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে গত কয়েক বছরে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেয়। ২০১৪ সালের শুরু থেকে পরিদর্শন করে ওই গ্রাহকের বিষয়ে আপত্তি জানায় বাংলাদেশ ব্যাংক। একাধিকবার ঋণ না দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু জনতা ব্যাংক সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে ওই গ্রুপকে বিভিন্ন নামে ঋণ দিতে থাকে। এভাবে গ্রুপকে ৫ হাজার কোটি টাকা ঋণ দেওয়া হয়েছে, যা আদায় অনিশ্চিত। এ ছাড়া ব্যাংকটি ক্রিসেন্ট গ্রুপ নামের একটি চামড়াশিল্প প্রতিষ্ঠানকে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। পরিদর্শনে জানার পর ওই গ্রুপকে ঋণ না দিয়ে আদায় করতে নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এ ক্ষেত্রে ওই গ্রুপকে নতুন করে ঋণ দিয়ে সেই টাকা জমা নিয়ে আগের ঋণের আদায় দেখানো হয়েছে।

এ ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে লোকসানে থাকায় অগ্রণী ব্যাংকের কানাডায় রেমিট্যান্স হাউসটি বন্ধের নির্দেশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বন্ধ করার প্রক্রিয়া শেষ করতে কানাডায় অর্থ প্রেরণের অনুমতি দেওয়া হয়। কিন্তু সেই নির্দেশ উপেক্ষা করে বাংলাদেশ ব্যাংককে না জানিয়ে ওই রেমিট্যান্স হাউস চালু রেখেছে অগ্রণী ব্যাংক। এমনকি অন্য বিভাগের অনুমোদন নিয়ে চেয়ারম্যান ও এমডি কানাডায় সফরও করে এসেছেন।

ব্যাংকের পরিচালক হতে হলেও বাংলাদেশের ব্যাংকের বিআরপিডির অনুমোদন প্রয়োজন হয়। ঋণখেলাপি ও ঋণ জালিয়াতির সঙ্গে যুক্ত কেউ ব্যাংকের পরিচালক হাতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের এমডিরা সংশ্লিষ্ট পরিচালকের ঋণখেলাপির তথ্য গোপন করে থাকেন। নতুন প্রজন্মের এনআরবি কমার্শিয়াল ব্যাংকের এক পরিচালক কামরুন সাকী অগ্রণী ব্যাংকের ঋণখেলাপি। কিন্তু তার পরিচালক পদে অনুমোদন নেওয়ার সময় অগ্রণী ব্যাংক এবং ওই ব্যাংকের এমডি বিষয়টি গোপন করেন। পরে অবশ্য দুই এমডিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক।