ঢাকা, শনিবার, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১ পৌষ ১৪২৬

খেলাপি ঋণ এখন ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা

https://www.jagonews24.com/economy/news/467525
BYনিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৭:৫১ পিএম, ০৬ ডিসেম্বর ২০১৮
>> ঋণ বিতরণ ৮ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা >> খেলাপি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকেও>> যাচাই-বাছাই না করেই দেয়া হচ্ছে ঋণ অনিয়ম দুর্নীতি নানা কেলেঙ্কারি আর চরম অব্যবস্থাপনায় নড়বড়ে দেশের ব্যাংকিং খাত। ফলে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ। চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে।

খেলাপি ঋণের ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর-১৮ প্রান্তিকের (সর্বশেষ) প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে ঋণ বিতরণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯৯ হাজার ৩৭০ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৪৫ শতাংশ। গত জুনে ৮ লাখ ৫৮ হাজার ৫২১ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকা, বা ১০ দশমিক ৪১ শতাংশ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দিচ্ছে সরকারি ব্যাংকগুলো। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালকরা নিজেদের মধ্যে ঋণ আদান-প্রদান করছেন। এ ছাড়া ঋণ বিতরণে অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতির করছেন। যাচাই-বাছাই না করেই দেয়া হচ্ছে ঋণ। বিশেষ সুবিধায় পুনর্গঠন করা ঋণ আবার খেলাপি হচ্ছে। ফলে লাগামহীনভাবে বাড়ছে খেলাপি ঋণ। তাই খেলাপির বিষয়ে সতর্ক ও সচেতন না হলে আগামীতে ভয়াবহ রূপ নেবে দেশের ব্যাংকিং খাত।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, অনিয়ম-দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। নিয়ম অনুযায়ী খেলাপির বিপরীতে নিরাপত্তা সঞ্চিতি রাখতে গিয়ে মূলধন ঘাটতি বাড়ছে। মোট কথা, মূলধন চলে যাচ্ছে। সরকারি ব্যাংকগুলোয় এ হার বেশি।

তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো যাচাই-বাছাই না করেই নামে-বেনামে ঋণ দিচ্ছে। ঋণের অর্থ নিয়মিত আদায় হচ্ছে না। আবার বিশেষ সুবিধায় এসব ঋণ পুনর্গঠনও করা হচ্ছে। তারপরও ঋণের অর্থ পরিশোধ করছে না। ফলে বেড়েই চলছে খেলাপি ঋণ। আর এ খেলাপি ঋণই এখন ব্যাংকের বড় সমস্যা হয়েছে দাঁড়িয়েছে। কারণ, খেলাপির বিপরীতে প্রভিশন রাখতে হয়। আর এটি রাখতে গিয়ে অনেক ব্যাংক মূলধনও খেয়ে ফেলছে। তাই খেলাপি ঋণের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কঠোর হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন সাবেক এ গভর্নর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাণিজ্যিক (সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল) ব্যাংকগুলোর এক লাখ ৫৩ হাজার ৯৩৩ কোটি টাকার মধ্যে ৪৮ হাজার ৮০ কোটি টাকা খেলাপি হয়ে গেছে, যা মোট ঋণের ৩১ শতাংশের বেশি। জুন শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৪২ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা, যা মোট ঋণের ২৮ দশমিক ২৪ শতাংশ।

সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ বেড়েছে বেসরকারি ব্যাংকগুলোরও। সেপ্টেম্বর শেষে ৪০টি বেসরকারি ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ৬ লাখ ৫৬ হাজার ৩১৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ ৪৩ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা। গত জুনে এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ৩৮ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা। মাত্র তিন মাসে তাদের খেলাপি ঋণ বেড়েছে ৪ হাজার ৬৯১ কোটি টাকা। ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে বেসরকারি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২৯ হাজার ৩৯৬ কোটি টাকা।

চলতি বছরের সেপ্টেম্বর শেষে বিশেষায়িত দুই ব্যাংকের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৫ হাজার ২৪১ কোটি টাকা হয়েছে, যা মোট ঋণের ২১ দশমিক ৬৮ শতাংশ। এই সময় তাদের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২৪ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা।

আলোচিত সময়ে বিদেশি মালিকানাধীন ৯ ব্যাংকের বিতরণ করা ৩৩ হাজার ৫৮২ কোটি টাকা ঋণের মধ্যে খেলাপি হয়েছে ২ হাজার ৩৮২ কোটি টাকা। গত জুনে এ খাতের ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণ ছিল ২ হাজার ২৭১ কোটি টাকা এবং গত ডিসেম্বর শেষে ছিল ২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংকগুলো প্রাহকদের যে পরিমাণ ঋণ বিতরণ করে তার বেশির ভাগই আমানতকারীদের অর্থ। আমানতকারীদের অর্থ যেন কোনো প্রকার ঝুঁকির মুখে না পড়ে সেজন্য বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে নানা বিধি-নিষেধ আরোপ করা আছে। এর একটি হলো প্রভিশন সংরক্ষণ। নিয়ম অনুযায়ী, ব্যাংকের অশ্রেণিকৃত বা নিয়মিত ঋণের বিপরীতে দশমিক ২৫ থেকে পাঁচ শতাংশ হারে প্রভিশন রাখতে হয়।

এ ছাড়া নিম্নমান বা সাব স্ট্যান্ডার্ড ঋণের বিপরীতে রাখতে হয় ২০ শতাংশ, সন্দেহজনক ঋণের বিপরীতে ৫০ শতাংশ এবং মন্দ বা কুঋণের বিপরীতে ১০০ শতাংশ প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকের আয় খাত থেকে অর্থ এনে এ প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয়।

এসআই/জেডএ/পিআর