ঢাকা, সোমবার, ১৬ জুলাই ২০১৮, ১ শ্রাবণ ১৪২৬

দেশের ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ এতিম ও বিকলাঙ্গ: সিপিডি

https://www.jugantor.com/economics/39209/দেশের-ব্যাংকিং-খাত-সম্পূর্ণ-এতিম-ও-বিকলাঙ্গ-সিপিডি
BY  যুগান্তর রিপোর্ট ১৭ এপ্রিল ২০১৮, ১৬:০২ | অনলাইন সংস্করণ
দেশের ব্যাংকিং খাত সম্পূর্ণ এতিম ও বিকলাঙ্গ। আর এ খাতের রক্ষকরাই (বাংলাদেশ ব্যাংক) বিভিন্ন চাপে পড়ে নানাভাবে এতিম শিশুর ওপর অত্যাচার করছে। এক্ষেত্রে ঋণের নামে ব্যাংকের টাকা দেশের বাইরে পাচার হচ্ছে। নির্বাচনী বছরে এই আশঙ্কা আরও বেড়েছে। সামগ্রিকভাবে যা দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।

মঙ্গলবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অর্থনৈতিক মূল্যায়নে বক্তারা এসব কথা বলেন।

তাদের মতে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব আয়ে ৫০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। সংস্থাটি মনে করে মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি (জিডিপি) কর্মসংস্থান-সংক্রান্ত সরকারি তথ্যে অসামঞ্জস্যতা রয়েছে। কারণ ব্যক্তিখাতের বিনিয়োগ গত তিন বছর পর্যন্ত স্থবির। এরপরও কর্মসংস্থান বাড়ছে।

বিপরীতে সামগ্রিকভাবে মানুষ আয় কমছে। অর্থাৎ দেশে আয়বিহীন কর্মসংস্থান হচ্ছে, যা অর্থনীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন সিপিডির বিশেষ ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড. মোস্তাফিজুর রহমান, নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন, গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম এবং গবেষণা ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান।

এ সময়ে তারা শুধু জনপ্রিয়তার চিন্তা না করে বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচনী বছরের বাজেট এবং সামষ্টিক অর্থনীতির জন্য সংযত নীতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছেন। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন খাতে দেশের উন্নয়নে কথা বলা হচ্ছে। কিন্তু অর্থনীতির নিয়মে উন্নয়নের ক্ষেত্রে ৪টি বিষয় লক্ষ্য করতে হবে। এর মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, মানুষের আয় বৃদ্ধি, পণ্যের উৎপাদন এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি সামঞ্জস্য থাকবে। যদি এই সামঞ্জস্য না থাকে, তবে এই ধরনের উন্নয়নের চিন্তার কারণ। অথবা উন্নয়নের যে পরিসংখ্যানগুলো বলা হচ্ছে, সেগুলো বিবেচনা করতে হবে।

তিনি বলেন, গত বছর আমরা বলেছিলাম দেশে কর্মসংস্থানবিহীন প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। অর্থাৎ জিডিপি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়ছে না। এ বছর আমরা বলছি আয়হীন কর্মসংস্থান। অর্থাৎ দেশে কর্মসংস্থান হচ্ছে, কিন্তু মানুষের আয় বাড়ছে না। অর্থনীতিতে এটি নতুন তত্ত্ব।

দেবপ্রিয় বলেন, প্রবৃদ্ধি ৬, ৭, ৮ যাই বলা হোক, তার ফলাফল পাওয়া যাবে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ে। মূল কথা হলো মানুষের কর্মসংস্থান এবং আয় বাড়ছে কিনা।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন-সংক্রান্ত সরকারি প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে ৫টি বৈশিষ্ট্য পাওয়া গেছে। সরকার বলছে, গত অর্থবছরে কর্মসংস্থান বেড়েছে। এই তথ্য যদিও ঠিক, তবে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেছে। এক বছরে গড়ে মানুষের আয় কমেছে ২ দশমিক ৫০ শতাংশ। দ্বিতীয়ত, পুরুষের চেয়ে নারীদের আয় বেশি কমেছে। তৃতীয়ত, শহরের চেয়ে গ্রামের আয় মানুষের আয় আরও কমেছে। চতুর্থ, শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েছে। সবশেষে আয়ের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক বৈষম্য বেড়েছে। খুলনা, বরিশাল, রাজশাহী ও সিলেটের মানুষের আয় বেশি কমেছে। এর মানে হলো কর্মসংস্থান বৃদ্ধিসংক্রান্ত সরকারের তথ্য সঠিক হলে ওই কর্মসংস্থান অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে হয়েছে। সেখানে আয় কম, শ্রমের অধিকার বা পরিবেশ নেই। অর্থাৎ দেশে আয়বিহীন কর্মসংস্থান হচ্ছে।

তিনি বলেন, সরকার ৭ দশমিক ৬৫ প্রবৃদ্ধি কথা বলেছে। এই পুরো প্রবৃদ্ধি হচ্ছে সরকারি বিনিয়োগের মাধ্যমে। ব্যক্তিখাতে বিনিয়োগ গত তিন বছর পর্যন্ত স্থবির হয়ে আছে। কিন্তু বিনিয়োগ স্থবির থাকলেও বেসরকারি খাতের ঋণ বাড়ছে। মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৬ দশমিক ৫ শতাংশ। কিন্তু বতর্মানে ওই লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। প্রশ্ন হলো বিনিয়োগ না বাড়লেও ঋণ বেড়েছে। এই টাকা গেল কোথায়। অন্যদিকে আমদানি ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে। এক্ষেত্রে সিপিডি বারবার বলে আসছে, আমদানির আড়ালে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে কিনা বিষয়গুলোতে মনোযোগ দেয়া দরকার।

তিনি বলেন, ঋণ বাড়বে, আমদানি বাড়বে কিন্তু বিনিয়োগ হবে না এটি কী ধরনের কথা। এখানে টাকা পাচার বিষয়টি সামনে চলে আসে।

ড. দেবপ্রিয় বলেন, আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। মুদ্রানীতির ক্ষেত্রে নিজের ঘোষিত নীতি মানেনি বাংলাদেশ ব্যাংক। কারণ মুদ্রানীতি ঘোষণার ৩ মাসের মধ্যেই নগদ জমার হার (সিআরআর) ১ শতাংশ কমিয়ে দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকে তারল্য ঘাটতির কথা বলা হয়েছে।

তিনি বলেন, তারল্য ঘাটতি কোনো রোগ না। এটি রোগের উপসর্গ মাত্র। বড় সমস্যা হলো বিকলাঙ্গ ব্যাংকিং ব্যবস্থা সৃষ্টি করা হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০১৭ সাল ছিল ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির বছর। আর ২০১৮ সালে খাত নিতান্তই এতিমে পরিণত হয়েছে। তাকে রক্ষা দায়িত্ব যাদের, তারাই এখন বিভিন্ন চাপে পড়ে নানাভাবে এতিম শিশুর ওপর অত্যাচার করছে।

তিনি আরও বলেন, মুদ্রানীতি, মুদ্রার বিনিময় হার ও ব্যাংকিং খাত নিয়ে সংযত আচরণ করতে হবে। বিশেষ করে ঋণের সুদের, মূল্যস্ফীতির হার এবং মুদ্রার বিনিময় হারের মধ্যে একটি সমন্বয় থাকতে হবে।

সিপিডির বিশেষ ফেলো বলেন, নির্বাচনী বছরে বড় একটি আশঙ্কার কারণ টাকা পাচার। নির্বাচনী খরচ মেটাতে বিদেশ থেকে যেভাবে রেমিট্যান্স (প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ) আসে, তার চেয়েও বেশি বিদেশে টাকা পাচার হয়। এক্ষেত্রে দেশে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা থাকলে আরও বেশি টাকা পাচার হয়। এই প্রক্রিয়ায় টাকা তছরুপের তিনটি খাত রয়েছে। এগুলো হল ব্যাংকিং খাত, শেয়ারবাজার এবং আমদানি খাত। ব্যাংকঋণ নিয়ে বিদেশে পাচার করা হয়। ফলে খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে অস্বাভাবিক আচরণ সৃষ্টি হয়। হঠাৎ করে নির্দিষ্ট কিছু কোম্পানির শেয়ারের দাম বাড়তে থাকে। আবার কিছুদিন পর পতন ঘটে। ফলে নির্বাচনী বছরে পুঁজিবাজার আবার তেজি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

তার মতে, নির্বাচনী বছরের বাজেটে পরামর্শ দেয়া কঠিন। কারণ একদিকে সরকারের বিশাল প্রত্যাশা থাকে। অপরদিকে সম্পদসহ বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে এর মাঝামাঝি অবস্থান থেকে বাজেট করতে হয়। ফলে সংযত সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা রাখা দরকার।

দেবপ্রিয় বলেন, চলতি অর্থবছরেও রাজস্ব আদায়ে নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা রয়েছে। গত বছর সিপিডি বলেছিল, রাজস্ব আদায়ে ৪২ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। এ বছরের হিসাব বলছে, বছর শেষে ৫০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি থাকবে। ফলে এই পরিমাণ অর্থ ব্যয়ও কমবে। অর্থাৎ সংশোধিত বাজেটে বড় অঙ্কের কাটছাঁট করতে হবে। এ কারণে সিপিডি বলছে, বাজেট ঘোষণার সময় বড় অঙ্কের ফিগার না দেখিয়ে একটু বাস্তবধর্মী হতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বাজেটের আকার নিয়ে আর্থিক ভ্রম সৃষ্টি করা হয়। উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, মূল জিনিস কম পানি বেশি। এবারের বাজেটেও মূল জিনিসের চেয়ে পানি বাড়ার আশঙ্কা বেশি। কারণ বাস্তবায়ন অসম্ভব হলেও নির্বাচনী বছরে বড় ব্যয় দেখানোর প্রবণতা থাকে।

দেবপ্রিয় বলেন, নির্বাচনী ডামাডোলের কারণে গরিব মানুষ মারা না যায়, সে বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা জরুরি। এক্ষেত্রে সরকারের ঘোষিত সামাজিক নিরাপত্তা খাতে আরও বেশি জোর দিতে হবে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির অংশ হিসাবে অর্থ বরাদ্দ বাড়াতে হবে। অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে আরও স্বচ্ছতা আনতে হবে। কোন খাতে কত ব্যয় হচ্ছে, তা পরিষ্কার হওয়া জরুরি। এছাড়াও এসডিজি বাস্তবায়নে একটি ট্রাস্ট ফান্ড গঠন করতে হবে।

৭ দশমিক ৬৫ শতাংশ জিডিপির প্রবৃদ্ধির তথ্য নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, প্রবৃদ্ধি এবং আয় নিয়ে তথ্য প্রকাশ করার কাঠামো একমাত্র রাষ্ট্রের রয়েছে। এর সমপরিমাণ বিকল্প তথ্যের উৎসের সুযোগ নেই। তবে বিভিন্নভাবে প্রকাশিত বিষয়ভিত্তিক তথ্যগুলো একটি অন্যটির সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ তা পর্যালোচনা করে একটি সম্ভাব্য রিপোর্ট প্রকাশ করে সিপিডি।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২০১০ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মানুষের আয়ে বৈষম্য বেড়েছে। অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের ব্যাপারে যেসব সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে, তা অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং নৈতিকভাবে অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত।

তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, কর্পোরেট কর কমানোর ব্যাপারে বিভিন্ন দাবি আসছে। এগুলোর কমানোর আরও বেশি বাস্তবধর্মী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা দুর্বল অবস্থানে রয়েছে। ফলে মুদ্রা ও রাজস্বনীতির মধ্যে আরও সমন্বয় জরুরি।

তিনি বলেন, ব্যাংকিং খাতে অবস্থা খুবই খারাপ। ফলে এখাতে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। অন্যদিকে আরেকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া উচিত। জনগণের করের টাকায় সরকারি ব্যাংকগুলোর মূলধনের জোগান দেয়া হচ্ছে। এর মানে হলো দুর্নীতির মাধ্যমে মূলধন ক্ষতিকে করের মাধ্যমে ভতুর্কি দেয়া হচ্ছে। এটি গ্রহণযোগ্য নয়। এ ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি স্বাধীন কমিশন গঠন করে এখাতের সংস্কার করতে হবে। এছাড়াও রাজস্ব আয় বাড়তে বকেয়া কর দিতে প্রতি নজর দেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

তার মতে, সাম্প্রতিক সময়ে লেনদেনের ভারসাম্যে অস্থিতিশীলতা দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।