ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
BY  যুগান্তর রিপোর্ট ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
দেশে ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামাতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উচ্চ খেলাপি ঋণ। শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সরকার ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে আনার ঘোষণা দিলেও তা কার্যকর করা হচ্ছে না। একটি গবেষণাপত্রে বিষয়টি উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, ঋণে ৯ ও আমানতে ৬ শতাংশ সুদহার প্রথমে ১ জুলাই ও পরে ৯ আগস্ট কার্যকর করার কথা ছিল। কিন্তু এ হার ৩৯টি ব্যাংক সেপ্টেম্বরেও কার্যকর করতে পারেনি।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট বিআইবিএম’র সপ্তম বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে গবেষণাপত্রে সুদহার সিঙ্গেল ডিজিট অতিক্রমের বিষয়টি উঠে আসে। গবেষণাপত্রটির ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে কয়েকজন আলোচক বলেন, এখনও ৯ শতাংশের ওপরে সুদ কাটছে বেশির ভাগ ব্যাংক। তারা বলেন, ঋণের সুদ সিঙ্গেল ডিজিটে নামাতে বড় বাধা উচ্চ খেলাপি ঋণ।

এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেশি খেলাপি বাংলাদেশে। এছাড়া প্রয়োজনের তুলনায় ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বেশি হওয়ায় অসুস্থ প্রতিযোগিতাও বেড়েছে। এসব কারণে কস্ট অব ফান্ড বেড়ে যাচ্ছে।

গবেষণাপত্রটি উপস্থাপন করে বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক ড. মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান বলেন, ২০১৭ সালে ব্যাংকিং খাতে গড় সুদের হার ছিল ৯.৫৪ শতাংশ। ২০১৬ সালে এটি ছিল ১০.২৬ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যাংকগুলোর গড় খেলাপি ঋণের হার ২০১৬ সালে ১১.৫৪ শতাংশ ছিল। ২০১৭ সালে তা কিছুটা কমে ১১.৪১ শতাংশে দাঁড়ায়। কিন্তু হুট করে ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে নিয়ে আসা সম্ভব নয়। এটা বাস্তবায়ন করতে সময় লাগবে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে বিআইবিএম’র সুপারনিউমারারি অধ্যাপক হেলাল আহমেদ বলেন, শুধু ঘোষণা দিয়েই সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এটি বাস্তবায়নের সঙ্গে অনেক বিষয় অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এর মধ্যে খেলাপি ঋণ সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া ব্যাংকগুলোর মধ্যে অসুস্থ প্রতিযোগিতা সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়ন না হওয়ার অন্য আরেকটি কারণ। বিআইবিএম’র অধ্যাপক নেহাল আহমেদ বলেন, অন্য দেশে যেখানে দুই থেকে তিন শতাংশ স্প্রেড রেট (ঋণ-আমানতে সুদহারের ব্যবধান), সেখানে বাংলাদেশের ব্যাংকগুলোয় স্প্রেড রেট চার থেকে পাঁচ শতাংশ। এর প্রধান কারণ খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি পাওয়া। খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে না এলে স্প্রেড রেট কখনোই নিম্নমুখী হবে না।

বুধবার সম্মেলনের প্রথম দিন বাংলাদেশ, চীন, থাইল্যান্ড ও শ্রীলংকার খেলাপি ঋণের একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, ২০১১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সবসময়ই বাংলাদেশের খেলাপি ঋণ বেশি ছিল। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বিতরণ করা ঋণের মধ্যে খেলাপি ঋণ ছিল ৯.৩০ শতাংশ (জুন ২০১৮ পর্যন্ত ১০.৪১ শতাংশ), যেখানে চীনের খেলাপি ঋণের হার ১.৭৪ শতাংশ, শ্রীলংকার ২.৫০ শতাংশ এবং থাইল্যান্ডের ছিল ৩.০৭ শতাংশ। বিআইবিএম’র আরেক সুপারনিউমারারি অধ্যাপক ইয়াসিন আলি বলেন, কিছু ব্যাংক পুঁজিবাজারে ব্যাপক বিনিয়োগ করছে। এ কারণে ব্যাংকিং খাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হচ্ছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে আসবে না।

এছাড়া আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চিত্র তুলে ধরে গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মো. আনোয়ারুল ইসলামের নেতৃত্বে ফাইন্যান্সিয়াল ইনক্লুশন ডিপার্টমেন্টের উপপরিচালক বীরেন্দ্র চন্দ্র দাস ও বিধান চন্দ্র সাহা। গবেষণাপত্রে বলা হয়, দেশে ব্যাংক হিসাবধারীর সংখ্যা বেড়েছে। ২০০৯-২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত কৃষকসহ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ১ কোটি ৭৯ লাখ ব্যাংক হিসাব খোলা হয়েছে। ব্যাংকিং খাতের মোট ৯ কোটি ২ লাখ হিসাবের মধ্যে ক্ষুদ্র আমানতি হিসাবের পরিমাণ ৮ কোটি ১৩ লাখ, যা মোট হিসাবধারীর ৯০.১২ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগে ১০ বছরে ক্ষুদ্র আমানত হিসাবের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ২.৩৭ গুণ বা ২৩৭ শতাংশ। অপরদিকে একই সময়ে বৃহৎ হিসাবের সংখ্যা বেড়েছে ৩.০৪ গুণ বা ৩০৪ শতাংশ। ক্ষুদ্র আমানতি হিসাবে জমা আছে মোট আমানতের মাত্র ৬ শতাংশ টাকা। কিন্তু বড় আমানত হিসাবে (যা মোট হিসাবের ১০ শতাংশ) জমা রয়েছে ৯৪ শতাংশ টাকা। ২০০৯ সালে ক্ষুদ্র আমানতি হিসাবে জমা ছিল মোট আমানতের ১৫ শতাংশ টাকা। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে ক্ষুদ্র আমানত হিসাব এবং মোট স্থিতি বাড়লেও এর তুলনায় বড় আমানতের স্থিতির প্রবৃদ্ধি ছিল ব্যাপক। এতে বোঝা যাচ্ছে, ধনী ও গরিবের বৈষম্য বড় আকার ধারণ করেছে।

এবারের বার্ষিক ব্যাংকিং সম্মেলনে দুই দিনে চারটি সেশনে ২২টি প্রবন্ধ উপস্থাপিত হয়। দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, ব্যাংকার, গবেষক ও শিক্ষার্থীরা এসব সেশনের আলোচনায় অংশ নেন। ব্যাংকিং সম্মেলনে জার্নাল এবং মিডিয়া পার্টনার হিসেবে রয়েছে যুক্তরাজ্যের সাইন প্রেস লিমিটেড, যমুনা টেলিভিশন, দৈনিক বণিক বার্তা, দি এশিয়ান এজ এবং নিউজ পোর্টাল অর্থখবর। অনলাইন পার্টনার আমরা নেটওয়ার্কস লিমিটেড। ২০১২ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে বড় এ অনুষ্ঠান আয়োজন করছে বিআইবিএম।