ঢাকা, শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

বাজারে ছেয়ে যাচ্ছে রাসায়নিক পদার্থ মিশ্রিত খেজুরের গুড়

http://news.zoombangla.com/বাজারে-ছেয়ে-যাচ্ছে-রাসায়/
January 13, 2018

শীতে বেড়েছে খেজুর গুড়ের চাহিদা। চাহিদার যোগানও দেওয়া হচ্ছে। তবে গ্রাম বাংলার চিরায়ত খেজুর গুড় দিয়ে নয়। আঁখের গুড়, চিনির মিশ্রণ ঘটানো হচ্ছে খেজুর রসে। এমনকি ব্যবহার করা হচ্ছে সোডা, ফিটকিরি, গাছের ছালসহ বিপজ্জনক সব রাসায়নিক পদার্থ। একশ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ীরা বাড়তি মুনাফা লাভের আশায় এভাবেই তৈরি করছেন ভেজাল খেজুর গুড়। নাটোরের গুরুদাসপুর পৌর সদরের চাঁচকৈড় বাজারস্থ গুড় উৎপাদনকারী অন্তত ১০টি কারখানায় অবাধে এসব ভেজাল গুড় তৈরি হলেও নেই প্রশাসনের কোন নজরদারী।

স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, প্রকৃত খেজুর গুড় বাজারে আসলেও সংখ্যায় কম। ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে বিশেষ প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে ভেজাল গুড়ের রঙ সাদা ও আকর্ষণীয় করা হচ্ছে। ফলে ক্রেতারা সাদরে তা গ্রহণ করছেন। পক্ষান্তরে প্রকৃত গুড়গুলো দেখতে তুলনামূলক কালো হওয়ায় তা ক্রেতারা কিনছেন না। ফলে স্বাদ গন্ধহীন সেই ভেজাল গুড়েই সয়লাব হচ্ছে গুরুদাসপুরের হাট-বাজার।

স্থানীয়দের মতে, চাঁচকৈড় বাজার ও নাজিরপুর বাজার এলাকায় অন্ততপক্ষে ১০জন অসাধু ব্যবসায়ী কারখানা খুলে হাজার হাজার মন ভেজাল গুড় তৈরি করছেন। তারা বাজার থেকে কমদামে নিম্নমানের ঝোলা ও নরম গুড় কিনে, গলিয়ে তাতে চিনি, রং, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকিরি ও বিশেষ গাছের ছাল গুড়া দিয়ে গুড় তৈরি করছেন। সেই গুড় স্থানীয় হাট-বাজারসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ট্রাক ভরে পাঠাচ্ছেন। কিন্তু প্রশাসন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

সরেজমিনে আজ শনিবার চাঁচকৈড়ের গুড় উৎপাদনকারী কয়েকটি কারখানায় গিয়ে দেখা যায়, বাজার থেকে কিনে আনা নিম্নমানের গুড়গুলো ময়লাযুক্ত মেঝেতে নোংরা স্যান্ডেল পায়ে শ্রমিকরা গুড়ো করছেন। পাশেই প্রকাশ্যে রাখা হয়েছে চিনির বস্তা। দিনভর ভেজাল গুড় তৈরি করা হচ্ছে। এসবই হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে। অথচ এই ভেজাল গুড়ই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাজারজাত করা হবে।

উপজেলার গুড়ের বড় মোকাম চাঁচকৈড় ও নাজিরপুর হাটে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মানভেদে প্রতি কেজি খেজুর গুড় ৮০-৯০ টাকা ও ঝোলাগুড় ৬০টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রান্তিক পর্যায়ের মৌসুমি গুড় উৎপাদনকারীরা এসব গুড় বিক্রি করছেন। গুড় উৎপাদনকারীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, কার্ত্তিক মাসের মধ্যভাগ থেকে চৈত্রমাসের প্রথম সপ্তাহ জুড়ে চলনবিল অঞ্চলের নাটোরের গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, লালপুর, পাবনার চাটমোহর উপজেলায় বিকল্প আয়ের পথ হিসেবে খেজুর গুড় উৎপাদন হয়ে থাকে।

উপজেলার চাঁচকৈড় হাটে গুড় বিক্রি করতে আসা প্রান্তিক গুড় উৎপাদনকারী রওশন আলী, খবির প্রামাণিক ও কোরবান আলী জানালেন, তারা প্রতিটি গাছের জন্য মালিককে মৌসুম ভিত্তিক (খাজনা) ২শ’ টাকা থেকে ৩শ’ টাকা দিয়ে থাকেন। মজুরি, জ্বালানি খরচ করে উৎপাদন খরচ ওঠে না। খাঁটি গুড়ের উৎপাদন খরচ পড়ে গড়ে ১শ’ টাকা। কিন্তু বাজারে এত দামে বিক্রি করা যায় না। তাই গুড়ের চাহিদা ও উৎপাদন খরচ পুষিয়ে নিতে প্রতি ১০ লিটার রসে দুই কেজি চিনি মেশান তারা। গুড়ের রঙ ফর্সা ও শক্ত করতে চিনিসহ বিভিন্ন পদার্থ মেশাতে হয়। চিনি মেশানো এই গুড়ে প্রকৃত স্বাদ-গন্ধ থাকে না। পিঠা-পায়েসে উপযোগিতাও থাকে না। তবে চিনিমুক্ত গুড়ে রঙ হয় কালো। তাতে প্রকৃত স্বাদ-গন্ধ অটুট থাকে। এই গুড় প্রতিকেজি ১শ’ টাকা থেকে ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়।

গুরুদাসপুর উপজেলা স্বাস্থ্যকমপ্লেক্সের আবাসিক চিকিৎসক রবিউল করিম জানান, খেজুর গুড়ে চিনি, রঙ, হাইড্রোজ, সোডা, ফিটকারিরমত ভেজাল মিশ্রণের কারণে খাদ্যনালীতে ক্যান্সার, কিডনি ড্যামেজ, লিভারে ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

গুরুদাসপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আব্দুল করিম জানান, উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নে ৬৮হাজার ৮৯০টি খেজুর গাছ রয়েছে। এরমধ্যে রস দেওয়ার উপযোগী গাছের সংখ্যা রয়েছে ৪১হাজার ৮১০টি। পরিসংখ্যান মতে, প্রতিটি গাছ বছরের শীত মৌসুমে ১৮০ লিটার রস দেয়। (প্রতি ১০ লিটারে ১ কেজি গুড় হয়)। ওই হিসাবে ৭২০ মেট্রিক টন গুড় উৎপাদন হয়। বাজারে প্রতি কেজি গুড়ের উৎপাদক পর্যায়ে ৭০ টাকা কেজি দরে আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৬ কোটি টাকার ওপরে। তবে ইটভাটার কারণে খেজুর গাছের সংখ্যা কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, খেজুর গুড়ে ভেজাল মেশানোর বিচ্ছিন্ন অভিযোগ তার কাছে রয়েছে। দ্রুত অভিযান চালানো হবে।

88SHARESShareTweet

প্রতিদিনের খবর পড়ুন আপনার ই-মেইল থেকে