ঢাকা, বুধবার, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮, ৫ পৌষ ১৪২৬

রিভিউ : স্বপ্ন আর ছেঁড়াজালে আবদ্ধ স্বপ্নজাল

https://www.jagonews24.com/entertainment/news/422053
BYবিনোদন প্রতিবেদক বিনোদন প্রতিবেদক প্রকাশিত: ০৬:৪১ পিএম, ১৭ এপ্রিল ২০১৮
মোস্তফা মনন

একটি ভালো মুভি বলতে আমরা যা বুঝি, তার প্রায় সবগুনই রয়েছে স্বপ্নজাল চলচ্চিত্রে। তাহলে জালটা ছেঁড়ার কথা কেনো বললাম? এই ছেঁড়া জালের কথা বলার আগে বলা প্রয়োজন- বাঙলা ভাষায়, বাঙলাদেশে যতগুলো ভালো মুভি রয়েছে, স্বপ্নজাল তার মধ্যে একটি হতে পারতো, খুব ভালো ভাবেই হতে পারতো, তাহলে কোনো পারলো না? স্বপ্নজালে অনেকগুলো চরিত্র, বেশির ভাগ চরিত্রের ধারাবাহিকতায় ঘাটতি ছিল। পারস্পারিক বোঝাপড়ার অভাব ছিল। কিছু ঘাটতি এবং অভাবের কথা বলার আগে বলা প্রয়োজন, কোথায় কোথায় স্বপ্নজাল অসাধারণ।

প্রথমত- নির্মাণ, দ্বিতীয়ত-সিনেমাটোগ্রাফি, তৃতীয়ত- অভিনয়, চতুর্থ হলো- মিউজিক, পঞ্চম- সংলাপ এবং অন্যান্য (সেট-প্রপস, লাইট, কস্টিউম, মেকাপ।)

নির্মাণ : এতো ভালো নির্মাণ খুব কম সিনেমাতেই দেখা যায়। এমন কোন দৃশ্য নেই, এমন কোন শট নেই, যা ভালো লাগেনি। বা এই দৃশ্যের প্রয়োজন ছিল না বা এই শটটি না দিলেও পারতো। নির্মাতা হিসেবে গিয়াস উদ্দিন সেলিম বেশ শক্তিশালী-তা প্রমাণিত হলো। প্রতিটি দৃশ্যের প্রতিটি অভিব্যক্তি খুব দারুণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন এই গুণী নির্মাতা।

দৃশ্য কম্পোজিশন, ব্লকিং, আর্টিস্ট মুভমেন্ট, ক্যামরা অপারেশন, দৃশ্যে পারসপেকটিভ তৈরি করা, ডেপথ অব কম্পোজিশন, ফ্রেমের ভেতর ফ্রেম তৈরি করে ঘটনাকে আকর্ষণীয় ও উপভোগ্য করা, এইসব টেকনিকাল আর এসথেটিক্যাল বিষয়গুলো ছিল বেশ উপভোগ্য। শুধু উপভোগ্যই না, এখানে পরিচালকের বুদ্ধিমত্তার প্রকাশ দেখা যায়। বুঝা যায়, খুব সচেতন ভাবে তিনি দৃশ্য আঁকতে চেয়েছেন এবং পেরেছেন। শুভ্রাদের বাড়ি, কোলকাতার বাড়ি, আর অপুদের বাড়ি বা আউটডোরের দৃশ্যগুলোতে আমরা এই সব বিষয় দেখতে পেয়েছি।

ক্যামেরার এংগেল ছিল ভাবার মত, বুঝার মতো। অভিজ্ঞ শিক্ষকের মতো গল্পের অভিব্যক্তি প্রকাশ করেছে ক্যামেরার এংগেলে। এখানেই একজন পরিচালককে বুঝা যায়, চেনা যায় এবং নিজেই জানান দেয় যে, সে কতটা জেনে-বুঝে কাজ করতে এসেছে। একজন শিক্ষিত নির্মাতার নির্মাণ দেখার মাঝে অানন্দ আছে, আছে উদ্বিগ্নতাও। গল্পের বুননে বুননে বুঝা যায় তার ফিল্মসেন্স কতটা ভালো এবং গভীর।

সিনেমাটোগ্রাফি : এতো পরিমিতবোধ সম্প্ন্ন সিনেমা খুব কমই হয়। এতো ভালো সিনেমাটোগ্রাফি হতে পারে, তা আবার প্রমাণ করলেন সিনেমাটোগ্রাফার কামরুল হাসান খশরু । এক কথায় অসাধারণ। নদীতে স্টিমার চলার দৃশ্য, বিশেষ করে কোলকাতা যাবার সময় শুভ্রা যখন স্টিমারে ছিল, আর অপু ছিল ঘাটে- তখন দেখা যায় স্টিমারটি ছেড়ে দিচ্ছে, আর শুভ্রা আস্তে আছে স্টিমারের গতির সাথে মিল রেখে দৌড়াচ্ছে- যেনো অপুর কাছে পৌঁছাতে চায়, কিন্তু পারছে না। আহ! কি অসাধারণ বেদনার দৃশ্য! কি কম্পোজিশন! কি ফটোগ্রাফি! এ রকম অনেক দৃশ্য আছে, অনেক শট আছে, দেখার সময় খুব ভালো লেগেছে। নদীর পাড়ে বড় দুটো গাছকে রেখে শুভ্রাদের কথোপকথন, শেষের দিকে শুভ্রার পানির দিকে ছুটে চলা- সব মিলিয়ে বলা যায়- নান্দনিক উপস্থাপনে আগ্রহ ছিল ফটোগ্রাফার আর পরিচালকের। আমরা দৃষ্টি জুড়িয়েছি তা দেখে।অভিনয় : এই মুভির সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো- পরীমনি। এখানে পরীকে পরিপূর্ণ ভাবে পাওয়া গিয়েছে। যদিও বেশ কয়েকজন যাদরেল অভিনেতা থাকতে আলাদা করে পরীর কথা বলা খুব কঠিন। তবে এই জন্য বলছি যে, পরীর আগে যে সব মুভিতে অভিনয় করেছে, তার সবগুলোকে ছাড়িয়ে অনন্য উচ্চতায় পৌঁছিয়েছে সে। এটা সম্ভব করেছে, সিনেমার পরিচালক এবং পরীর গ্রহণ করার ক্ষমতা।

অভিনয় করতে হলে যে সব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হয়, সে সব বিষয়ে পরী ছিল বেশ সচেতন। বিশেষ করে সংলাপ প্রক্ষেপন, এ্যাকশান, রিয়্যাকশান, নিরব অভিব্যক্তি, হাঁটা, বসা, তাকানো-সব মিলিয়ে স্বস্তি লাগা মায়াময় সুন্দর স্বাভাবিক অভিনয়। অভিনয় করতে হলে আলাদা করে অভিনয় করার প্রয়োজন নেই, শুধু চরিত্রটি বুঝে- চরিত্রের সাথে পথচলাই সত্যিকারের অভিনেতার কাজ,পরী এখানে সফল। পরীমনি এখানে শুভ্রা হতে চেয়েছিল এবং পেরেছে। সিনেমাতে শুধু থিয়েটার প্রাকটিসের অংশে যে নন্দিনীকে চিনি, সেখানে পরীর একটু ঘাটতি ছিল বলে মনে হয়েছে। তারপরও নিজেকে তৈরি করার ক্ষমতায় পরী ছিল অসাধারণ। বড় অভিনেতা হবার পথে হাঁটছে পরীমনি।

ইরেশ যাকের, শহীদুল আলম সাচ্চু, পরীর মা শিল্পী সরকার অপু, মিশা সওদাগর এবং সবশেষে ফজলুর রহমান বাবু। বাবু এতো অসাধারণ অভিনয় করেছে-যা অবিশ্বাস্য। এতো বড় অভিনেতা তিনি- গর্ব করার মতো। এতো ভালো একটি চরিত্র, এতো ভালো ভাবে নিজেকে উপস্থাপন করা- নিজেকে মানিয়ে নেওয়া বা নিজেকে তৈরি করা, খুব কঠিন। কিন্তু কঠিন কাজটাই তিনি খুব স্বাবলীল ভাবে করেছেন। ফজলুর রহমান বাবু'র নামের আগে "বিশেষজ্ঞ অভিনেতা" বলা উচিত। আর আমরা আরেকজন অভিনেতাকে পেয়েছি, সে হলো অপু চরিত্রে-ইয়াস রোহান। সহজ এবং সপ্রতিভ।

মিউজিক : ফলিও সাউন্ড, ব্যকগ্রাউন্ড স্কোর, গান সব মিলিয়ে বেশ উন্নত। নদীতে বাতাস, রাতের নিশ্তব্দতা, কোলকাতার নাগরীক কোলাহল, সব মিলিয়ে বেশ ভালো। তবে আয়নাল গাজীর বমি করার ফলিও সাউন্ড ভালো লাগে নি। বাজারের সস্তা কমেডি মনে হয়েছে। এইটুকু দর্শক হাসানোর অভিপ্রায়ে করা হলে-তা হবে সিনেমার জন্য ক্ষতিকর। সংলাপ : নদীর পাড়ে শুভ্রার বিদায়ী সংলাপ 'আমার মনটাকে তোমাকে কাছে রেখে গেলাম, মনটাকে মোর বসতে দিও, মুড়ি মুড়কি খেতে দিও। জলের গ্লাস দেয়ার ছলে একটু শুধু ছুঁয়ে দিও’ শুভ্রার মুখে একটি সুন্দর ছড়ার মতো ভালো লেগেছে, আবার খাপছাড়াও লেগেছে। আমরা আগে পরে যদি দেখতাম এই ছোট ছোট কাজগুলো, আঙ্গুল ছোঁয়া, জলের গ্লাস ধরতে যাওয়া, চকিত চাহনী, এইসব মুহুর্তগুলো যেহেতু পাই নি, তাই এই সুন্দর সংলাপের প্রয়োজনীয়তা হালকা হয়েছে। অথবা শুভ্রার মুখে আর কোন ছড়া আমরা আগে পরে দেখতে পাইনি।

শুভ্রার আরেকটি সংলাপ মন ছুঁয়ে যায়- ‘পিয়ন কাকুকে চিঠির বান্ডেল হাতে দেবদূতের মত লাগে।' কত সরল আর কত মমতা আর কত গভীর এই সংলাপ। এই ধরনের সংলাপ সিনেমাকে শক্তিশালী করে। অপুর সাথে আয়নাল গাজীর নানান সময়ে দেখা হওয়ার প্রাক্কালে একই সংলাপ নানান ভংগিতে ডেলিভারি দেওয়া- অপু না! বাবা কই? কী অসাধারণ। স্বপ্নজালের অন্যান্য সংলাপও বেশ গভীর আর শক্তিশালী ছিল।

অন্যান্য : সেট, প্রপস, লাইট, কস্টিউম এই চারটি প্রধান স্তম্ভ প্রতিটি দৃশ্যে সঠিক ছিল। কোথাও কোন ঘাটতি চোখে পড়ে নি। সব কিছু ছিল ছবির মতো সাজানো গুছানো সুন্দর এবং নান্দনিক। স্বপ্নজাল সিনেমায় আলোর ব্যবহারে ছিল পরিমিত এবং বাস্তবত। প্রাকৃতিক আলো আবার কৃত্তিম (ইনডোর) আলো, সব খানেই যৌক্তিক মনে হয়েছে। লাইট সোর্স, আলোর পরিমান, প্রক্ষেপন, সাবজেক্ট অবজেক্টের ব্যবধান, আলোদিয়ে ফ্রেমে লেয়ার তৈরি করা- সব মিলিয়ে খুব ভালো হয়েছে। লাইট ডিজাইনার ঠিকঠাক মতো কাজটি করতে পরেছে বলে মনে হয়েছে।

চরিত্র অনুযায়ী কস্টিউম আর মেকাপ ছিল সবচেয়ে ভালো। বিশেষ করে পরীর উপস্থাপন আমার কাছে বেশি ভালো লেগেছে। এতো ন্যাচারাল মনে হয়েছে যে, মেকাপ দিয়েছে কি না বুঝা যায় নি। হতে পারে অনেক দৃশ্যে মেকাপ দেয় নি। মেকাপ দেক বা না দেক, সিনেমায় দেখায় আড়ষ্টতা ছিল না। এইটাই বড় কথা। আরেকজনের মেকাপ বেশ ভালো হয়েছে, আয়নাল গাজী (বাবু)। তার চরিত্রের সময়, মানসিক, শারীরিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে যা দেখানো হয়েছে, তা ছিল এক কথায় অসাধারণ।

সিনেমাটার ঘাটতি : স্বপ্নজালে অনেকগুলো চরিত্র, বেশির ভাগ চরিত্রের ধারাবাহিকতায় ঘাটতি ছিল। উদাহরণ দিচ্ছি। গল্পে আমরা দেখি, নায়ক বেশ সাহসী। সে সাহস করে কোলকাতায় যায়, পায়ে গুলি খায়, তারপরও দমে যায় না, শুভ্রার কাছে যাবেই-এই ছিল তার ব্রত। আরো পরে দেখি, শুভ্রার বাবার খুনিকে ধরার জন্য অনেক বড় ঝুঁকি নিয়ে দিনরাত শুভ্রার সাথে নানান স্থানে আসা যাওয়া করে। এখানে হিরো (অপু) বেশ সাহসী আর বুদ্ধিমান। আয়নাল গাজীর (ফজলুর রহমান বাবু) মতো এতো বড় ক্রিমিনাল থাকতেও সে শুভ্রার সাথে সাথে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিল, বড় গাছের ছায়া হয়ে আগলে রেখেছিল। এখানে পরিচালক তাকে নায়ক করে তুলেছেন। আমরা বাহবা দেই। বাঙলা চলচ্চিত্রে বা বাঙলা সাহিত্যে বহুকাল কেউ নায়ক হয়ে ওঠে নাই। আমরা হয়তো একজন নায়কের দেখা পাবো- এই প্রত্যাশায় গল্পের সাথে এগিয়ে যাই।

গল্পের শেষের দিকে পরিচালক আমাদের সাহসী নায়কে জনপ্রিয় ধারার সিনেমার নায়ক বানাতে গিয়ে অহেতুক ক্লাইমেক্স আনার চেষ্টা করেছেন। অপুর বাবা মায়ের কথায় শুভ্রাকে উপেক্ষা করে পড়াশোনার জন্য ঢাকায় যেতে রাজী হয়। যে নায়ক বড় গাছের ছায়া হয়ে শুভ্রাকে আগলে রেখেছিল, সেই নায়ক বাবা মায়ের এক কথায় শুভ্রাকে বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়ে ঢাকায় পড়তে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হয় এবং লঞ্চেও উঠে।

নদীতে যাত্রীবাহী লঞ্চ চলছে, সাথে অপুর বাবা। হঠাৎ নায়কের হুশ হয়, যখন নদী দিয়ে বিয়ের বরযাত্রী নিয়ে পাশ দিয়ে আরেকটি লঞ্চ যায়। তখন নায়ক দৌড়ে পানিতে ঝাপ দেওয়াটাকে সঠিক মনে করে। এবং আমাদের অপরিপক্ক নায়ক বীরের মতো পানিতে ঝাপ দিয়ে ভীরুর মতো ডুবে মরে যায়- এখানেই সিনেমারটার আসল মৃত্যু ঘটে। এখানেই গল্পটি সুতা-কাটা ঘুড়ির মতো গোত্তা খেয়ে পানিতে পড়ে। কোন কারণ ছিল না এসব করার। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ধীরে ধীরে যে চরিত্রকে বড় করলো, সেই চরিত্রকে দর্শকদের আবেগ আর অনভূতিকে 'বাণিজ্যিক আঘাত' দেওয়া ছলে আত্মহত্যার দিকে ঠেলে দিল। অনেকটা সতীদাহের মতো, স্বামীর সাথে স্ত্রীকেও চিতায় যাওয়া। নায়ককে পানিতে ফেলতে গিয়ে নির্মাতা নিজেই তার সিনেমাটিকে নিয়ে ঘোলা পানিতে লাফ দিয়ে পড়ে গেলেন। এই যে পানিতে একবার পড়লো, আর উঠতে পারলো না।

ন্যাড়া বেল তলায় একবার যায়, স্বপ্নজাল নির্মাতা গেলো দুবার। শুভ্রার বেলায়ও আমাদের আক্ষেপে ভাসিয়ে আরেকবার পানিতে ঝাপ দিলো পরিচালক এবং স্ক্রিপ্ট রাইটার গিয়াসউদ্দীন সেলিম স্বয়ং । যে শুভ্রাকে সাহসী দেখানো হলো, তাকে হঠাৎ ভিরু বানিয়ে দিল কেনো? যে শুভ্রা তার মাকে দৃঢ়তার সাথে বলেছিল- 'যখন আমরা বিপদে ছিলাম, তখন কোথায় ছিল সে সমাজ। কে সহযোগীতা করেছিল, তুমি জানো না।'’

আমরা তখন শুভ্রার পক্ষে চলে গেলাম। যে শুভ্রা নিজের ধর্মকে উপেক্ষা করে হিরোকে বিয়ে করতে চেয়েছিল, রাতের আঁধারে অপুদের বাড়ি গিয়ে তার বাবা মায়ের সামনে অপুর সাথে থাকার কথা প্রকাশ করেছিল। আর সেই সাহসী শুভ্রা কিনা বাড়িতে পূজো দিতে আসা এক ধর্মগুরুর কথায় সব মেনে নিল? চরিত্রের ধারাবাহিকতায় তা একটু বেমানান। চরিত্রের উত্থান-পতন থাকে, তবে শেষ দিকে এই পরাজয়ে বড় আক্ষেপ লাগে এই ভেবে যে, চরিত্রকে বড় করে মেরে ফেলেছে অবহেলায় অথবা অসচেতনতায়। আয়নাল গাজী ছাড়া অন্যান্য চরিত্রগুলোও পূর্নাঙ্গতা পেয়েছে বলে মনে হয় নি। খানিকটা খাপছাড়া খাপছাড়া লেগেছে।

এবার অপুর বাবাকে দেখি খুব সাহসী, সে আয়নাল গাজীর সাথে তর্ক করে চলে আসে, আবার দেখি ভীতু। প্রতিবেশি শুভ্রার বাবা খুন হয়েছে বুঝেও কোন কথা বলে নি, বা অপু যখন ঢাকা যেতে চায়নি, বাবা পাশে দাঁড়িয়ে সমর্থন করলেও স্ত্রীর দাপটে একে বাড়েই চুপসে গেল। আবার ছেলে নিঁখোজ-কবে বাবা মা কেমন যেনো নিপ্রভ। অপুর বাবা মায়ের চরিত্রটাও তাই, অসম্পন্ন।

চাঁদপুর শহরটাকে আরো সুন্দর ভাবে উপস্থাপন করা যেতে পারতো। গল্পের যে সময় ধরা হয়েছে, সেই সময়ে ব্যাংকে ত্রিশ লাখ টাকা থাকার কথা না। যদিও বা থাকে, তাহলে ফোন করে অন্যকাউকে দিতে বলল, আর ব্যাংক ম্যানাজার দিয়েও দিলো- বিষয়টা খটকা লাগে।

বাঙলা ভাষায়, বাঙলাদেশে যতগুলো ভালো মুভি হয়েছে, স্বপ্নজাল তার মধ্যে একটি হতে পারতো, খুব ভালো ভাবেই হতে পারতো। শুধু সিনেমার দার্শনীক দিক অত্যন্ত নাজুক বলে তা আর সম্ভব হয় নি। প্রতিটি গল্পের একটি দার্শনীক প্রত্যয় থাকে। সিনেমা দেখে আমাদের অর্জন কি, তা সামাজিক ভাবেই হউক আর মনস্তাত্বিক ভাবেই হউক-কিছু একটা থাকতে হয় সিনেমায়।

তবে গল্পের একটি দিক বেশ ভালো লেগেছে, তা হলো- মন্দ লোকদের পরিনতি। খানিকটা গ্রিক ট্রাজেডির মতো, নিজেদের বিছানো জালে নিজেরাই আটকা পড়েছে, বিষয়টা বাঙলা সিনেমায় অভিনব এবং আকর্ষণীয়।

দিন শেষে আমরা আমাদের সমাজের তরুণদের কি আত্মহত্যার দিকেই ঠেলে দিচ্ছি? এটাই কি সমাধান? স্বপ্নজালে কয়েকটা দৃশ্যে কেয়ামত থেকে কেয়ামত সিনেমার পোষ্টারের ব্যবহার দেখলাম। সেখানেও কিন্তু দু'জনই আত্মহত্যা করেছিল। এখানেও আত্মহত্যাই করলো নায়ক। কেনো আত্মহত্যা করতে হবে তাকে? খুব হালকা আর সস্তা সহানুভূতি পাবার লোভ সামলানো দরকার ছিল পরিচালকের। এখানে পরিচালকের কথা কেনো বলছি? একটা সিনেমায় কি দেখাবে আর কি দেখাবে না, তা পরিচালকই নির্ধারণ করেন। কারন, পরিচালক চেনা যায় তার গল্প নির্বাচন এবং গল্প বলার ঢংয়ের জন্য। এখানে ভালো আর মন্দের দোষ-গুণ তাকেই নিতে হয়। আর স্বপ্নজালের গল্প, চিত্রনাট্য, পরিচালনা একজনই।

সিনেমার স্বপ্নটা ভালো ছিল সব ঠিকঠাক মতোই এগিয়ে যাচ্ছিল, গল্পের জাল শেষে একটু ছিঁড়ে যায়, তাতেই সিনেমার নান্দনীক সৌন্দর্যে আঘাত পড়ে। যার দায়টুকু রাইটার আর পরিচালককে নিতে হবে।

গল্পের দায়- দায়িত্বটুকু নিয়ে কথা না বলতেই পারতাম- বলার কারণ হলো- ফিল্মসেন্স সম্পন্ন একজন শিক্ষিত পরিচালকের গল্পের এই ঘাটতিটুকু থাকা উচিত নয়। ফিল্মতো এতদিনের জন্য না, একটি ভালো ফিল্ম একজন নির্মাতার সারাজীবনের পরিচয় বহন করে। সবশেষে বলবো- স্বপ্নজাল একটি সুন্দর, নিটোল ভালোবাসা আর হাহাকারের দেশীয় গল্প। স্বপ্নজাল মুক্তি পেয়েছে ৬ এপ্রিল। সিনেমাটির গল্প, চিত্রনাট্য, পরিচালনা গিয়াস উদ্দিন সেলিমের। অভিনয় করেছেন পরিমনি, ইয়াশ রোহান, ফজলুর রহমান বাবু, ইরেশ যাকের, শিল্পী সরকার অপু, শহীদুল আলম সাচ্চু, ফারহানা মিঠু, মিশা সওদাগর, শাহেদ আলী, শাহানা সুমী, মুনিয়া ইসলাম, নরেশ ভুঁইয়া. খালেকুজ্জামান, কাজী উজ্জ্বল, আহসানুল হক মিনু

এমএবি/আরআইপি