ঢাকা, শুক্রবার, ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬
BY  সাংস্কৃতিক রিপোর্টার ০৯ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
রাজধানীর বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে বৃহস্পতিবার সকালে অষ্টম ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮ শুরু হয়েছে। হেমন্তের সকালে ফিতা কেটে উৎসবের উদ্বোধন করেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর। তার সঙ্গে ছিলেন বলিউড অভিনেত্রী ও নির্মাতা নন্দিতা দাস, পুলিৎজার বিজয়ী লেখক এডাম জনসন, উৎসবের তিন পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ, সাদাফ সায্ ও আহসান আকবার। এ উৎসব উপলক্ষে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের মিলনমেলায় পরিণত হয়।

একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে মুনমুন আহমেদ, অপরাজিতা মুস্তাফা ও রেওয়াজ পারফরমিক আর্টের কত্থক নৃত্যের মধ্য দিয়ে লিট ফেস্ট শুরু হয়। অনুষ্ঠানের সবখানে ছিল শিল্প-সাহিত্যের বিনিময় ও ভাব প্রকাশ, মুক্তিচিন্তার চর্চা ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান। অবশ্য এর মাঝেই উচ্চারিত হল বাক-স্বাধীনতা শঙ্কার কথা। সৃজনকর্মের এ বাধাটুকু কাটিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যাশায় শুরু হল তিন দিনের ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮। প্রথম দিন নন্দিতা দাসের ‘মান্টো’ চলচ্চিত্রের বাংলাদেশ প্রিমিয়ারসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু সেশন অনুষ্ঠিত হয়।

সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ১৯৭৪ সালে বাংলা একাডেমি একটি সাহিত্য উৎসবের আয়োজন করে। সেখানে

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানালে তিনি অগ্রাহ্য করেন। তিনি বলেন, ‘আমি একজন রাজনীতিবিদ, সাহিত্যিকদের এ মিলনমেলায় আমি কিভাবে যাই।’ এরপর স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা হিসেবে বঙ্গবন্ধুকে উপস্থিত থাকার অনুরোধ করলে তিনি একটি শর্ত দেন। তিনি বলেন, ‘সেখানে কবি জসীমউদদীন, চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদীন ও অধ্যাপক আবদুল মতিন চৌধুরীকে অবশ্যই উপস্থিত থাকতে হবে।’ বঙ্গবন্ধু সৃজনশীল ও জ্ঞানের ওপর বিশ্বাস করতেন। ঠিক এমনটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও করেন। তিনি সব সময় সংস্কৃতিকে প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। তিনি বলেন, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ঢাকা লিট ফেস্টের অংশ হতে পেরে আমরা গর্বিত।

কাজী আনিস আহমেদ বলেন, সম্প্রতি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে বাক-স্বাধীনতা হরণের একটি চেষ্টা করা হচ্ছে। ঢাকা লিট ফেস্ট সব সময় মুক্তচিন্তা এবং বাক-স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। ঢাকা লিট ফেস্ট বরাবরই নারী, রোহিঙ্গা ইস্যু ও বাক-স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলে। লিট ফেস্টে কেউ কথা বলতে বাধার সম্মুখীন হয় না। এটা একটি মুক্ত জায়গা, খোলামেলা আলোচনা করার জায়গা।

সাদাফ সায্ সিদ্দিকী বলেন, বিশ্বের সব জায়গায় মুক্তচিন্তার জায়গা সঙ্কুচিত হয়ে আসছে। সেখানে এরকম আয়োজন করতে গেলে অনেক বাধার সম্মুখীন হতে হয়। এ ধরনের আয়োজনে আমরা যেসব বিষয়ে সরাসরি আলোচনা করব তা বিশ্বের কোথাও হয়ত একত্রে করা সম্ভব নয়। নারীবাদ, # মি টু, রোহিঙ্গাসহ নানা বিষয়ে আলোচনায় উঠে আসবে বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতা। ফলে ঢাকা লিট ফেস্টের ধারণাটি অনেক শক্তিশালী।

আহসান আকবার বলেন, পুলিৎজার, অস্কার, কমনওয়েলথের মতো নামিদামি পুরস্কার বিজয়ীরা এবার এসেছেন। বাংলাদেশকে বিশ্বের সাহিত্য অঙ্গনে নিয়ে যাওয়াই এ আয়োজনের প্রধান লক্ষ্য। নন্দিতা দাস বলেন, আমার অনুরোধ বাংলাদেশের রাজনীতিবিদ এবং ঢাকা লিট ফেস্টের তিন পরিচালককে, আপনারা ভারতে আসুন এবং বাক-স্বাধীনতা নিয়ে কথা বলুন।

বঙ্গবন্ধুর সময় নষ্ট করে নেতাকর্মীরা নিজেদের কর্তৃত্ব দেখলেও তারা বঙ্গবন্ধুর অনেক ক্ষতি করেছিল জাতীয় অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামানের জবানিতে উচ্চারিত হলেও কথাগুলো আসলে ‘বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায়’ বই থেকে উদ্ধৃতি। ‘ঢাকা লিট ফেস্ট-২০১৮’-এর উদ্বোধনী দিনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি বই ‘মুজিব ভাই’ ও ‘শেখ মুজিব ট্রায়ামফ অ্যান্ড ট্র্যাজেডি’ নিয়ে আলোচনা করা হয়।

‘পোস্ট-আমেরিকা ফিউচার’ শিরোনামে ঢাকা লিট ফেস্টের উদ্বোধনী অধিবেশন সঞ্চালনা করেন উৎসবের অন্যতম পরিচালক কাজী আনিস আহমেদ। এতে আলোচনা করেন অ্যাডাম জনসন, ডেভিড বিয়েলো, জেমস মিক, কোর্টনি হোডেল ও নিশিদ হাজারি। অ্যাডাম জনসন বলেন, যে কোনো কর্তৃত্ববাদী সরকার ব্যবস্থার ফলাফল হিসেবে শোষিত গোষ্ঠী আরও বেশি শোষণের শিকার হয়। আর এর পেছনে সেই সরকার রাষ্ট্রের সামষ্টিক উন্নতির চিন্তাকে কারণ হিসেবে দাঁড় করায়। ‘সময়ের গান, অসময়ের কবিতা’ অধিবেশনে যোগ দেন সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ও কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন। তারা শোনান ছোট থেকে বড়বেলার গান। সঞ্চালনা করেন কবি শামীম রেজা।

নেতা না অভিনেতা- কোন পরিচয়ে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন জানতে চাইলে আসাদুজ্জামান নূর বলেন, অনুভবের জায়গা থেকে কথা উঠলে বলব- এখন নাটক করছি। গ্যালিলিও নিয়ে মঞ্চে ফিরেছি। জীবনে ফুটবল, হকি, ক্রিকেট, বিতর্ক, নাটক, ফুলের বাগান, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ সবই করেছি। তাই কোনোটাই ঠিকঠাক করা হয়ে উঠেনি। রাজনীতিতে মানুষের যে ভালোবাসা, মানুষের জন্য কিছু করতে পারার যে আনন্দ, তা অনন্য। সত্যি বলতে দু’দিকেই একটা আনন্দ আছে, প্রাপ্তি আছে।

ইমদাদুল হক মিলন বলেন, একটা সময় মানুষ বই পড়ত। এখন অবশ্য সেটা কমে গেছে। এ সময় তিনি মজা করে বলেন, এখন কিছু লিখে বাড়িতে পড়তে দিলেও মেয়ে পৃষ্ঠা উল্টে বলে ৫০০ টাকা দাও। এটা পড়তে তো আমার সময় লাগবে!

আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মঞ্চে ‘ক্র্যাশিং রিয়েলিটিস’ শিরোনামের অনুষ্ঠানে কথা বলেন পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক মোহাম্মদ হানিফ। তার সঙ্গে ছিলেন ব্রিটিশ সাহিত্য ম্যাগাজিন গ্রান্টার নির্বাহী সম্পাদক রস পর্টার। মাত্র ২৪ ঘণ্টার জন্য তিনি ঢাকায় এসেছিলেন। তিনি কথা বলেন তার নতুন বই ‘রেড বার্ডস’ নিয়েও।

দুপুর সাড়ে ১২টায় একাডেমির কসমিক টেন্টে আয়োজিত ‘প্রকাশনা শিল্প ও বইয়ের বিপণন’ শীর্ষক আলোচনায় যোগ দেন প্রকাশক খান মাহাবুব, মিলন কান্তি নাথ, সৈয়দ জাকির হোসেন, মারুখ মহিউদ্দীন এবং পশ্চিমবঙ্গের ‘দে প্রকাশনা’র প্রকাশক অপু দে।

বাংলাদেশের মেয়ে নাইমা। রিকশা চালানোর ইচ্ছে তার প্রবল। ওকে ঘিরেই মিতালি বোস লিখেছেন ‘রিকশা গার্ল’ উপন্যাসটি। ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিন বৃহস্পতিবার (৮ নভেম্বর) দুপুরে বাংলা একাডেমি লনে ‘নিউইয়র্ক লাইব্রেরি নির্বাচিত গত শতাব্দীর সেরা ১০০ শিশুসাহিত্য’ তালিকায় স্থান করে নেয়া এ বইটি নিয়ে সুপ্রভা তাসনিমের সঙ্গে মনখোলা আড্ডায় মাতেন তিনি। সবার সামনে তুলে ধরেন তার লেখক জীবনের ইতিবৃত্ত, সংগ্রাম ও প্রেরণার গল্প।

কবি শামসুর রাহমান সেমিনার হলে আয়োজিত হয় আলোচনা সভা ‘যে গল্পের পাঠক নেই।’ ছোট গল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করা হয় সভায়। এতে অংশগ্রহণ করেন সাহিত্যিক মইনুল আহসান সাবের, সাহিত্যিক আহমেদ মুস্তফা কামাল, সাহিত্যিক হামীম কামরুল হক ও সাহিত্যিক রাশিদা সুলতানা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ছোট গল্পকার পারভেজ হোসাইন। বিকাল ৩টার পর্বে কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে ছিল ‘ভাঙ্গা-গড়ার দিনগুলো : স্মৃতিচারণে বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে আলোচনা। এতে অংশ নেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সাংবাদিক আফসান চৌধুরী ও কাইয়ূম খান।

আজ উৎসবের দ্বিতীয় দিন শুক্রবার বেলা সোয়া ১১টায় বাংলা একাডেমির আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে ‘ব্রেকিং ব্যাড’ নামে বিশেষ সেশনে কথা বলবেন মনীষা কৈরালা ও নন্দিতা দাস। তাদের সঙ্গে থাকবেন উৎসবের অন্যতম পরিচালক সাদাফ সায্। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় ও বাংলা একাডেমির সহযোগিতায় এ উৎসবের আয়োজক যাত্রিক। উৎসবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউন। সহ-পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংক।