ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন ২০১৯, ১৩ আষাঢ় ১৪২৭

মমতাজউদদীন আহমদ স্মরণে নাগরিক শোকসভা মঙ্গলবার

http://www.prothomalo.com/entertainment/article/1598771/মমতাজউদদীন-আহমদ-স্মরণে-নাগরিক-শোকসভা-মঙ্গলবার
BYনিজস্ব প্রতিবেদক,ঢাকা
১২ জুন ২০১৯, ২১:২৩

নাটকের মানুষ মমতাজউদদীন আহমদ নেই। তাঁর চলে যাওয়ার ব্যথাতুর বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে আগামী মঙ্গলবার তাঁকে স্মরণ করবেন, শ্রদ্ধা জানাবেন দেশের সংস্কৃতি ও শিক্ষাঙ্গনের বন্ধু ও স্বজনেরা। তাঁরা বলবেন মমতাজউদদীন আহমদের কথা, ফেলে আসা দিনের গল্প। মূল্যায়ন করবেন নাটকের মানুষ, শিক্ষক মানুষ মমতাজউদদীন আহমদকে। অনুষ্ঠানটি যৌথভাবে আয়োজন করেছে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট ও বাংলা একাডেমি। মমতাজউদদীন আহমদের ভাগনে শাহরিয়ার মাহমুদ আজ বুধবার প্রথম আলোকে জানান, ১৮ জুন বিকেল ৫টায় অনুষ্ঠিত হবে নাগরিক শোকসভা। এতে সভাপতিত্ব করবেন জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান। অনুষ্ঠানে তিনি ছাড়া আরও বক্তব্য দিতে পারেন নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার, মামুনুর রশীদ, সাবেক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর,সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ, বিজিএমইএর সভাপতি রুবানা হক,বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর আতিউর রহমান, সাংবাদিক আবেদ খান, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী প্রমুখ। দীর্ঘদিন ধরে ফুসফুসের সংক্রমণে ভুগছিলেন মমতাজউদদীন আহমদ। ২৬ এপ্রিল অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। ১২ মে আবার বাসায় নেওয়া হয়। পরে আবার ১৬ মে থেকে অ্যাপোলো হাসপাতালে নেওয়া হয়। বেশির ভাগ সময়ই তিনি নিবিড় পর্যবেক্ষণে ছিলেন। ২ জুন দুপুরে সবকিছুরই ঊর্ধ্বে চলে গেলেন মমতাজউদদীন আহমদ।

১৯৩৫ সালের ১৮ জানুয়ারি ব্রিটিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলার হাবিবপুর থানার আইহো গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন মমতাজউদদীন আহমদ। তাঁর বাবা কলিমুদ্দিন আহমদ ও মা সখিনা বেগম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় বিএ (অনার্স) ও এমএ ডিগ্রি লাভ করেন। ছাত্রাবস্থায় তিনি বাম রাজনীতিতে যুক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালে গোলাম আরিফ টিপুর সঙ্গে তিনি রাজশাহীতে ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন। সেই সময় রাজশাহী কলেজে বাংলাদেশের প্রথম শহীদ মিনার নির্মাণেও ভূমিকা রাখেন। রাজনীতিতে সম্পৃক্ততার কারণে চারবার কারাবরণ করেন।

মমতাজউদদীন আহমদ ৩২ বছরের বেশি বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি কলেজে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও ইউরোপীয় নাট্যকলায় শিক্ষকতা করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি চট্টগ্রাম কলেজের বাংলা বিভাগের শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা শুরু করেন। তিনি জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা ও সংগীত বিভাগের খণ্ডকালীন অধ্যাপক হিসেবে শিক্ষকতা করেছেন। তিনি ১৯৭৬-৭৮ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচি প্রণয়নে একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৭-৮০ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির গবেষণা ও প্রকাশনা বিভাগের পরিচালক ছিলেন। ২০১১ সাল থেকে তিনি জাতিসংঘের বাংলাদেশের স্থায়ী মিশনে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।মমতাজউদদীন আহমদ শিক্ষক ও লেখক হিসেবে পরিচিতি পেলেও মঞ্চনাটকের মাধ্যমে তাঁর কর্মজীবনকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। সংস্কৃতি অঙ্গনের কর্মী হিসেবে সক্রিয়ভাবে ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। তাঁর লেখা নাটক ‘কী চাহ শঙ্খচিল’ ও ‘রাজা অনুস্বরের পালা’ রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে তালিকাভুক্ত।

মমতাজউদদীন আহমদের লেখা জনপ্রিয় নাটকগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বিবাহ’, ‘স্বাধীনতা আমার স্বাধীনতা’, ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’, ‘বর্ণচোরা’, ‘এই সেই কণ্ঠস্বর’, ‘সাতঘাটের কানাকড়ি’, ‘রাজা অনুস্বরের পালা’, ‘বকুলপুরের স্বাধীনতা’, ‘সুখী মানুষ’, ‘রাজার পালা’, ‘সেয়ানে সেয়ানে’, ‘কেস’, ‘ভোটরঙ্গ’, ‘উল্টো পুরাণ’, ‘ভেবে দেখা’ উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া তাঁর বেশ কিছু নাটক বাংলাদেশের প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।

শতাধিক বই লিখেছিলেন মমতাজউদদীন আহমদ। তাঁর লেখা বইগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘বাংলাদেশের নাটকের ইতিবৃত্ত’, ‘বাংলাদেশের থিয়েটারের ইতিবৃত্ত’, ‘প্রসঙ্গ বাংলাদেশ’, ‘প্রসঙ্গ বঙ্গবন্ধু’, ‘আমার ভেতরে আমি’, ‘জগতের যত মহাকাব্য’, ‘মহানামা কাব্যের গদ্য রূপ’, ‘সাহসী অথচ সাহস্য’, ‘নেকাবী এবং অন্যগণ’, ‘সজল তোমার ঠিকানা’, ‘এক যে জোড়া, এক যে মধুমতী’, ‘অন্ধকার নয় আলোর দিকে’। সর্বশেষ ১ জুন বিশ্বসাহিত্য ভবন থেকে প্রকাশ পায় তাঁর সর্বশেষ বই—‘আমার প্রিয় শেক্‌সপিয়ার’।

১৯৯৭ সালে নাট্যকার হিসেবে একুশে পদকে ভূষিত হন মমতাজউদদীন আহমদ। এ ছাড়া বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, শিল্পকলা একাডেমি বিশেষ সম্মাননা, শিশু একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, আলাউল সাহিত্য পুরস্কারসহ দেশ-বিদেশের বহু সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।