ঢাকা, সোমবার, ২২ জুলাই ২০১৯, ৭ শ্রাবণ ১৪২৭
BYমাসুম আলী
২৭ জুন ২০১৯, ১৩:৫৬

নব্বই দশকের জনপ্রিয় চার অভিনেতা শহীদুজ্জামান সেলিম, আজিজুল হাকিম, তৌকীর আহমেদ, জাহিদ হাসান অভিনয় শিল্পী সংঘের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ১০৬ জন সদস্য নিয়ে আজ থেকে ২০ বছর আগে যাত্রা করেছিল এই সংগঠন। মাঝে নানা কারণে বেশ লম্বা একটা সময় নিষ্ক্রিয় থাকার পর সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১০ ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় অভিনয় শিল্পী সংঘের দ্বিবার্ষিক নির্বাচন। সে কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নতুন কমিটির জন্য নির্বাচন জরুরি ছিল। প্রতীক্ষার পর ২১ জুন অনুষ্ঠিত হলো নির্বাচন। সোমবার বিজয়ীরা শপথ নিলেন। বিস্তারিত লিখেছেন মাসুম আলী ‘অভিনয় শিল্পী সংঘের নির্বাচনে...আমরা ক’জন পুরান পাপী...হা হা হা...’—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গত ২১ জুন দুপুরে শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে তোলা একটি ছবি দিয়ে এ মন্তব্য করেছেন জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী। ছবিতে তাঁর সঙ্গে ছিলেন সালাহউদ্দিন লাভলু, শাহনাজ খুশি, আ খ ম হাসান, শামীম জামানসহ আরও বেশ কয়েকজন। সেদিন সারা দিন এমন অসংখ্য মুহূর্তের সাক্ষী হয়েছিল বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণ। সেখানে ছিল উৎসব; ভোটের উৎসবে মেতেছিলেন ছোট পর্দার নবীন-প্রবীণ, তারকা, ভোটপ্রার্থী অভিনয়শিল্পীরা।

ভোট নয়, উৎসব২১ জুন সারা দিন অভিনয়শিল্পীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ দেখে মনে হয়েছিল, এমন একটি দিনের জন্য সবাই যেন মুখিয়ে ছিলেন। একাধিকবার দিন, তারিখ নির্ধারিত হয়েও তা পিছিয়ে যাওয়া, আগের দিন আদালতের আদেশসহ নানা কারণে নির্বাচন নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত ২১ জুন নির্বাচন হয়ে যাওয়াটা ছিল অংশগ্রহণকারীদের জন্য মধুর সমাপন। তবে এখানে শেষ হয়ে যায়নি। কেন, সে প্রসঙ্গে পরে আসছি।

আগে নির্বাচনের দিনটির গল্প বলি। কে ছিলেন না এই নির্বাচনী উৎসবে? ছিলেন অভিনেতা ও সাংসদ আসাদুজ্জামান নূর থেকে শুরু করে সাংসদ সুবর্ণা মুস্তাফা; ছিলেন দিলারা জামান, শর্মিলা আহমেদ কিংবা আলী যাকের থেকে শুরু করে একালের তারকামুখগুলো।

বেশ কড়াকড়ি ছিল। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় সংগীত ও নৃত্যকলা ভবনের নিচের মহড়াকক্ষে ছিল ভোট দেওয়া-নেওয়ার আয়োজন। ভোটার এবং নির্বাচন কমিশনার ছাড়া সেখানে কারও প্রবেশের অনুমতি ছিল না। তিনটি স্তর পেরিয়ে ভোটাররা ঢুকতে পেরেছেন সেখানে। ভেতরে যাওয়ার আগে মোবাইলটাও রেখে যেতে হয়েছে। তারকা কিংবা জ্যেষ্ঠ শিল্পীদেরও নিয়ম মেনে ভোটকেন্দ্রের ভেতরে যেতে-আসতে দেখা গেল।

সফল নির্বাচনবেলা সোয়া ১১টার কথা বলি। ভোটকেন্দ্রের বাইরে আড্ডা দিচ্ছিলেন সভাপতি পদপ্রার্থী শহীদুজ্জামান সেলিমসহ (পরে নির্বাচিত) আরও কয়েকজন। কেমন ভোট পড়ছে? সাড়া কেমন পাচ্ছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে শহীদুজ্জামান সেলিম বলেন, ‘অতীতে দেখেছি, ছুটির দিনে মূলত দুপুরের পর ভোটারের চাপ বাড়ে। কিন্তু আজ যেভাবে ভোট পড়ছে, মনে হচ্ছে দুপুরের আগে ৪০ শতাংশ ভোট পড়বে, শেষ বেলায় ৯০ এমনকি ৯৫ শতাংশ ভোট পড়বে।’ হলোও তাই। নির্বাচনে ভোটার ছিলেন ৬০৬ জন। এর মধ্যে টোকেন সংগ্রহ করে ভোট দিয়েছেন ৫১৪ জন।
অভিনব ভোট গণনাআরেকটি দৃশ্যের কথা বলি। তখন সন্ধ্যা সাতটা। ভোট দেওয়া-নেওয়া শেষ। দেখা গেল বাইরে বিশাল সমাবেশ। কেউ সিঁড়িতে, কেউ চেয়ারে, কেউবা দাঁড়িয়ে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন বড় একটি পর্দার দিকে। এই ভিড়ে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী আহসান হাবিব নাসিম যেমন ছিলেন, তেমনি ছিলেন আজিজুল হাকিম, বিজরী বরকতউল্লাহ, জাকিয়া বারী মম, ইন্তেখাব দিনারের মতো পরিচিত মুখও। পর্দায় সরাসরি ভোট গণনা সম্প্রচার করা হচ্ছিল। সারা দিনের ব্যস্ততার পরে ফলাফল জানতে এভাবে তীর্থের কাকের মতো বসে থাকাও প্রমাণ দেয়, কতটা উৎসবমুখর ছিল আয়োজনটি।গলাগলি ছিল, দলাদলি নয়উৎসবমুখর আয়োজনে গলাগলি ছিল বটে, ছিল না দলাদলি। দুপুরে শিল্পকলা একাডেমির মাঠে শামিয়ানার নিচে বসে খাবারের টোকেনে স্বাক্ষর দিতে দিতে এ কথাই মনে করিয়ে দিয়েছিলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত সাংগঠনিক সম্পাদক পদপ্রার্থী অভিনেতা লুৎফর রহমান জর্জ। জানালেন, এভাবে নির্বাচিত হতে চাননি তিনি, ভোটাভুটির মধ্য দিয়ে জয়ী না হওয়ার আফসোস উপচে পড়ছিল তাঁর কণ্ঠ দিয়ে। চারদিকে দেখিয়ে বললেন, এমন প্রাণবন্ত সমাগম আগে কখনো হয়নি, যেখানে ভোট হয়েছে, কিন্তু কোনো দলাদলি নেই। সবাই এক প্যানেলে ভোট করছে।’ ফলাফল ঘোষণার পরই বিজয়ী সভাপতি শহীদুজ্জামান সেলিম আর পরাজিত তুষার খানের জড়িয়ে ধরা দেখে কথাটি আবার মনে পড়েছিল। যথার্থ মনে হয়েছিল ভোটের ব্যানারে লেখা স্লোগানটিকেও, ‘জিতবে ২১ জুন, হারবে না কেউ’।কাল অভিষেক অনুষ্ঠানভোট হয়েছে, ফলাফল পাওয়া গেছে। কিন্তু ২১ বিজয়ীর শপথ গ্রহণের আগে ‘নটে গাছটি মুড়োলো’ বলা যাবে না। দায়িত্ব গ্রহণ করেনি নতুন কমিটি। কারণ কিছু অপ্রকাশিত জটিলতা বাধাগ্রস্ত নির্বাচন পরবর্তী কার্যক্রমকে। তবে শেষ পর্যন্ত শপথ হলো। ২৪ জুন রাতে অভিনয় শিল্পী সংঘের নিকেতন কার্যালয়ে সীমিত আয়োজনে বিজয়ী প্রার্থীরা শপথ নিলেন। পুনর্নির্বাচিত সাধারণ সম্পাদক আহসান হাবিব নাসিম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি সরকারিভাবে নিবন্ধিত সংস্থা। আমরা সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থার অনুমোদন পেয়েছি। সে আলোকে শপথও নিয়েছি। আগামীকাল শুক্রবার বিকেল ৪টায় শিল্পকলা একাডেমির চিত্রশালা মিলনায়তনে নতুন কার্যকরী পরিষদের অভিষেক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এ আয়োজনে সাংবাদিক এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমাদের পরবর্তী কার্যক্রম, আগামী পরিকল্পনা জানিয়ে দেব।’

সব মিলিয়ে এবার ‘মধুর সমাপন’ লিখলে বাড়াবাড়ি হবে না, এটা বলাই যায়।