ঢাকা, শনিবার, ২৪ আগস্ট ২০১৯, ৯ ভাদ্র ১৪২৭

ডেঙ্গুজ্বরে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ কার্যকারিতা হারাচ্ছে

https://www.jugantor.com/todays-paper/first-page/201409/ডেঙ্গুজ্বরে-গুরুত্বপূর্ণ-অঙ্গ-কার্যকারিতা-হারাচ্ছে
BY  রাশেদ রাব্বি ২১ জুলাই ২০১৯, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
এবারের ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত বেশিরভাগ রোগীর বিভিন্ন অঙ্গ দ্রুত অকার্যকর হয়ে (মাল্টি অর্গান ফেইলিওর) পড়ছে। যা আগের বছরগুলোতে দেখা যায়নি। পাশাপাশি হচ্ছে এনক্যাফালাইটিস (মস্তিস্কে প্রদাহ) রোগও- এমন মন্তব্য বিশেষজ্ঞদের। তাদের মতে, এর আগে ডেঙ্গুর দুটি সেরোটাইপ (ধরন) দিয়ে আমাদের দেশের মানুষ আক্রান্ত হয়েছিল। যেখানে মূলত হেমোরেজিক ফিভারে (রক্তক্ষরণজনিত জ্বর) মানুষের মৃত্যু ঘটত। কিন্তু এবার নতুন সেরোটাইপ-৩ আরও ভয়াবহ। সেখানে দেখা যাচ্ছে আক্রান্তদের হার্ট, কিডনি, লিভার ডেঙ্গুর কারণে স্বল্পসময়ে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। যা আক্রান্ত রোগীকে মৃত্যুর দিকে ধাবিত করছে।

বিদ্যমান ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে একে উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। শনিবার রাজধানীতে এক বৈঠক শেষে এমন মন্তব্য করে ডব্লিউএইচও’র প্রতিনিধি দল। সব মিলিয়ে দেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করলেও এটাকে মহামারী বলতে নারাজ সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি অবশ্যই আউটব্রেক (প্রাদুর্ভাব)। তবে সামগ্রিকভাবে তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ না করে এবং আক্রান্তের সঠিক পরিসংখ্যান না জেনে এটাকে মহামারী বলা যাবে না। তবে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা থেকে মানুষকে বাঁচাতে চিকিৎসকদের জন্য পকেটবুক আকারে গাইডলাইন প্রদান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, দেশের বিভিন্ন হাসপাতালের ডেঙ্গু রোগীদের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবারের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের শরীরের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ (কিডনি, লিভার, ফুসফুস, হার্ট) আক্রান্ত হয়ে অকার্যকর হয়ে পড়ছে। সাধারণত ডেঙ্গুবাহিত এডিস মশা কামড়ের পর রক্তের মনোসাইটে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জীবাণু বংশবিস্তার করে। প্রবহমান রক্তের মাধ্যমে এসব জীবাণু শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যেমন: হার্ট, কিডনি, লাং, লিভারে প্রবেশ করে। সেখানে গিয়েও তারা আরও অধিক হারে বংশবিস্তার করে এসব গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের কোষের কার্যকারিতা নষ্ট করে দেয়। এ ছাড়া এসব অঙ্গের কোষঝিল্লিতে আক্রমণ করে প্রদাহের সৃষ্টি করে। এতে কিডনির মূত্র উৎপাদনের কার্যকারিতা হ্রাস পায়। যা রেনাল ফেইলিওর হিসেবে পরিচিত। একইভাবে লিভার ফেইলিওর সৃষ্টি করে ডেঙ্গু জীবাণু।

ডেঙ্গুর জীবাণু রক্তের মাধ্যমে হার্টে প্রবেশ করে হার্টের মাংশপেশির বলয় ভেঙে সেখানে আক্রমণ করে। এতে হার্টের কার্যকারিতা হ্রাস পায়। এ অবস্থাকে হার্টের মায়াসাইটিক বলা হয়। এ ছাড়া এবারের ডেঙ্গুর জীবাণু হার্টের কোষঝিল্লিতে আক্রান্ত করে। ফলে সেখানে পানি জমতে থাকে। এ অবস্থাকে পেরিকার্ডিয়াম বলে। এসব কারণে হার্ট ফেইলিওর হয়ে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু ঘটা অস্বাভাবিক নয়।

এ ছাড়া এবার ডেঙ্গুর সেরোটাইপ আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্কে আক্রমণ করছে। মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষে বা নিউরনে আক্রমণ করে মস্তিষ্কের তীব্র প্রদাহ বা এনক্যাফালাইটিস সৃষ্টি করে। উপযুক্ত সময়ে যথাযথ চিকিৎসা না পেলে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী মৃত্যুর দিকে ধাবিত হয়।

এ প্রসঙ্গে আইইডিসিআরের (রোগতত্ত্ব রোগ নিয়ন্ত্রণ গবেষণা প্রতিষ্ঠান) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. মাহমুদুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, ডেঙ্গুর এই নতুন সেরোটাইপ এবং মাল্টি অর্গানে আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি গত বছরও লক্ষ করা গেছে। তবে এবার সেটি ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। কিন্তু যেহেতু বিষয়টি নতুন তাই এ প্রসঙ্গে পরিষ্কার ধারণা পেতে হলে অবশ্যই অধিকতর গবেষণা প্রয়োজন। পাশাপাশি এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হলে সরকারের পক্ষ থেকে স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করতে হবে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৫০ শতাংশ সাধারণ ও মারাত্মক ধরনের ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বর্তমানে প্রতিবছর মারাত্মক ধরনের ডেঙ্গুজ্বরে কমপক্ষে ৫ লাখ মানুষ আক্রান্ত হন। প্রতি মিনিটে বিশ্বের কোথাও-না-কোথাও কেউ-না-কেউ ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। তাদের অধিকাংশই শিশু। আক্রান্তদের মধ্যে বছরে ২২ হাজার ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে চলতি মাসের গত ২০ দিনে ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩ হাজার ৯৬০ জন। অর্থাৎ গড়ে প্রতিদিন ১৯৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। আর এ রোগে মৃত্যু ঘটেছে ৫ জনের। বেসরকারি হিসাবে মৃতের সংখ্যা ২২। তবে প্রকৃত মৃতের সংখ্যা কত তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

এবারের ডেঙ্গু প্রসঙ্গে প্রখ্যাত মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. এবিএম আবদুল্লাহ যুগান্তরকে বলেন, একজন রোগী দ্বিতীয়বারের মতো ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হলে তার ঝুঁকি এমনিতেই বেড়ে যায়। চলতি বছর ডেঙ্গু সেরোটাইপ-৩ দ্বারা সংক্রমণ হচ্ছে বলে জানা গেছে। ফলে এবারের ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীদের রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেশি দেখা যাচ্ছে। যে অবস্থানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘ডেঙ্গু শক সিনড্রম’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এটি ডেঙ্গুর মডিফায়েড ফর্ম। লক্ষণ আগের মতো নয়। তাপমাত্রাও তুলনামূলক কম থাকে (১০১-১০২ ডিগ্রি ফারেনহাইট)। হাড় বা শরীরের সংযোগস্থলে ব্যথাও হয় না। ফলে অনেকেই বুঝতে পারেন না। থেমে থেমে বৃষ্টিপাত দেশব্যাপী ডেঙ্গুর প্রকোপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। এই প্রকোপ আগামী শীত পর্যন্ত চলতেই থাকবে। তাই যে কেউ শরীরে যে কোনো ধরনের জ্বর অনুভব করলে অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করবেন। যাতে করে অন্তত পরীক্ষার ম্যাধমে নিশ্চিত হওয়া যায় ডেঙ্গুর আক্রমণ হয়েছে কি না।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশনস সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সহকারী পরিচালক ডা. আয়েশা আক্তার যুগান্তরকে জানান, গত ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬ হাজার ৪৫ জন। এর মধ্যে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৪ হাজার ৫৬৬ জন এবং বর্তমানে ভর্তি রয়েছেন ১ হাজার ৪৭৪ জন। তবে শুধু গত ২০ দিনেই এ রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ হাজার ৯৬০ জন। জুনে এ সংখ্যা ছিল ১৭৬১ জন। মৃত ৫ রোগীর মধ্যে দু’জন এপ্রিলে, দু’জন জুনে এবং চলতি মাসে একজনের মৃত্যু হয়।

তবে ডেঙ্গু আক্রান্তের এ সংখ্যা শুধু রাজধানীর ১২টি সরকারি হাসপাতাল এবং ৩৫টি বেসরকারি হাসপাতাল থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর প্রকৃত সংখ্যা এর চেয়ে কয়েক গুণ বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রকৃতপক্ষে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা অনেক বেশি। তাদের মতে, এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে তাতে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হিসাব অনুযায়ী, গত বছর সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৮৪ জন সারা দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তার মধ্যে ২৬ জন মারা যান। এর আগে ২০০২ সালে ৬ হাজার ২৩২ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সর্বোচ্চ রেকর্ড ছিল। তবে চলতি জুলাই মাসের প্রথম ১৭ দিনের চিত্র দেখে দেশে ডেঙ্গুর অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে যেতে পারে বলে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা।

এদিকে বাংলাদেশে ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। শনিবার বনানীতে ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের বাসভবনে বৈঠক শেষে এমনটাই জানায়, ডব্লিউএইচও’র এক প্রতিনিধি দল। পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন, বাংলাদেশে ডব্লিউএইচও’র ভারপ্রাপ্ত প্রতিনিধি ড. এডউইন স্যানিজা স্যালভেদর।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ড. এডউইন বলেন, বাংলাদেশে এবার উদ্বেগজনকভাবে ডেঙ্গুতে আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হলেও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আর পরিস্থিতি আরও নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা সিটি কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং অন্য সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে কাজ করতে চাই। এরই অংশ হিসেবে মেয়রের সঙ্গে বৈঠক করেছি আমরা। কীভাবে আমরা একসঙ্গে কাজ করে সমস্যার সমাধান করতে পারি, তা নিয়ে আলোচনা করেছি। তিনি বলেন, যেখানে সমস্যা আছে, তার সমাধান বের করতেই কাজ করব আমরা। এডিস মশা বাংলাদেশে নতুন আসেনি, অনেক আগে থেকেই ছিল। এ সমস্যা মোকাবেলায় সঠিক পরিকল্পনা দরকার। আশপাশের দেশগুলো এবং আগের বছরের অবস্থা তুলনা করলে দেখা যাবে সার্বিক পরিস্থিতি বেশ জটিল। তবে মহামারী বা আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু না।

ডিএসসিসি মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু পয়েন্ট দিয়েছি। যেমন: আমাদের ওষুধ কার্যকর কি না, তারা পরীক্ষা করে দেখবে, ওষুধে পরিবর্তন দরকার কি না, দরকার হলে তা কেমন হবে কিংবা নতুন ওষুধ দরকার কি না, তা পরীক্ষা করে দ্রুত জানাবে। বিগত কয়েক বছরের তুলনায় এবার ডেঙ্গুর প্রকোপ অনেক বেশি। তবুও আশপাশের অনেক দেশের তুলনায় আমরা ভালো অবস্থানে আছি। পরিস্থিতি এখনও নিয়ন্ত্রণে আছে। আর এটিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে জনসচেতনতার কোনো বিকল্প নেই।

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. সানিয়া তাহমিনা যুগান্তরকে বলেন, এবার ডেঙ্গুর পজেটিভ কেস পর্যাপ্ত পাওয়া যাচ্ছে। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসায় ন্যাশনাল ডেঙ্গু গাইডলাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সেই গাইডলাইন অনুসারে চিকিৎসা করা হলে রোগীদের দ্রুত সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তবে মাঝে মাঝে কিছু রোগী হাসপাতালে আসেন মুমূর্ষু অবস্থায় সেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকদেরও কিছু করা থাকে না। তিনি বলেন, ডেঙ্গুতে বেসরকারি হাসপাতালেই বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। তাই আমরা ডেঙ্গু গাইডলাইনের একটি পকেটবুক করে চিকিৎসকদের মাঝে বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আশা করছি, এক সপ্তাহের মধ্যে সেটি সম্ভব হবে।