ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট ২০১৯, ৫ ভাদ্র ১৪২৭

জব্বারের বলীর চ্যাম্পিয়ন এবার কুমিল্লার শাহজালাল

http://bangla.bdnews24.com/ctg/article1616503.bdnews
BY  উত্তম সেন গুপ্ত, চট্টগ্রাম ব্যুরো,  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published: 25 Apr 2019 08:08 PM BdST Updated: 25 Apr 2019 08:55 PM BdST

বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের লালদিঘী মাঠে জব্বারের বলী খেলার ১১০তম অসর অনুষ্ঠিত হয়।

প্রায় ২৩ মিনিট ধরে চলা এ খেলায় শাহজালাল ও জীবন কেউ কারো পিঠ মাটিতে লাগাতে পারেনি। তাই পয়েন্টের হিসেবে ৩:১ ব্যবধানে কুমিল্লার হোমনার বাসিন্দা শাহাজালালকে জয়ী ঘোষণা করেন রেফারি।

বলী খেলার গত আসরে কক্সবাজারের চকরিয়ার বাসিন্দা জীবনের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন শাহজালাল। ১৪ মিনিট ধরে চলা এ খেলায় ‘অবৈধ কৌশল’ অবলম্বন করার অপরাধে রেফারি শাহজালালকে খেলার অযোগ্য করে জীবনকে জয়ী ঘোষণা করেছিলেন।

দুপুরে বলী খেলা শুরুর আগে থেকেই নগরীর লালদীঘি ময়দানে হাজারো দর্শক জড়ো হয়েছিল। কানায় কানায় পূর্ণ মাঠের আশপাশের বিভিন্ন ভবনের ছাদে উঠেও মানুষ দেখে ঐতিহ্যবাহী এ বলী খেলা। ঢোল বাজনার তালে তালে তারা সমর্থন জোগাতে থাকেন বলীদের।

চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে জব্বারের বলী খেলায় বিজয়ী কুমিল্লার শাহজালাল বলী। ছবি: সুমন বাবু

কিশোর থেকে শুরু করে বৃদ্ধ নানা বয়সী ১১১ জন বলী এ বছরের আব্দুল জব্বারের বলী খেলার ১১০তম আসরে অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে গতবারের চ্যাম্পিয়ন, রানার্স-আপসহ কমিটির বাছাই করা ১৬ জন সরাসরি চ্যালেঞ্জ রাউন্ডে অংশ নিয়েছে।

এ চ্যালেঞ্জ রাউন্ড থেকেআট জন কোয়ার্টার ফাইনালে অংশ নেন। আর সেমিফাইনালে মহেশখালীর শাহাবউদ্দিনকে পরাজিত করে ফাইনালে ওঠেন শাহজালাল। মহেশখালীরই মোহাম্মদ হোসেনকে পরাজিত করে ফাইনালে ওঠেন গতবারের চ্যাম্পিয়ন জীবন।

সেমিফাইনালে শাহজালাল ৪ মিনিট ৪৫ সেকেন্ডে শাহাবউদ্দিনকে পরাজিত করলেও জীবন ও মোহাম্মদ হোসেনের খেলাটি প্রায় ১২ মিনিট ধরে চললেও কোনো ফলাফল আসেনি। পরে রেফারি টচ করে খেলাটির ভাগ্য নির্ধারণ করেন।

ভাগ্য নির্ধারণী টচে জয়ী হয়ে ফাইনালে খেলেন গতবারের চ্যাম্পিয়ন জীবন। 

ফাইনাল শুরুর পর তৈরি হয় দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা। দুই ভাগে ভাগ হয়ে দর্শকরা শাহজালাল ও জীবনকে উৎসাহ দিতে থাকেন। 

খেলা শুরুর পর থেকেই দুজনই কৌশল অবলম্বন করে খেলে যাচ্ছিলেন। শাহাজালাল কিছুটা শক্তি প্রয়োগ করলেও জীবন ছিলেন সব সময় কৌশলী। তাদের কৌশলী ও শক্তিমত্তার খেলা দেখে মনে হচ্ছিল ‘কেউ কাহারে নাহি ছাড়ে’।

রেফারি বারবার কৌশলের পাশাপাশি খেলায় শক্তি প্রয়োগের তাগাদা দিলেও দুইজনই নিজেদের মতো করে খেলে যাচ্ছিলেন। ২২ মিনিট ২৬ সেকেন্ড পর ৩:১ পয়েন্টে শাহজালালকে জয়ী ঘোষণা করেন রেফারি।

গত আসরে জীবনকে জয়ী ঘোষণার পর শাহজালাল যেভাবে প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন, ঠিক একইভাবে এবার জীবনও প্রতিবাদ জানাতে থাকেন রেফারির সিদ্ধান্ত নিয়ে।

চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে বৃহস্পতিবার জব্বারের বলী খেলায় বিজয়ী কুমিল্লার শাহজালাল তার প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করার একটি মুহূর্ত। ছবি: সুমন বাবু

জীবনের অভিযোগ, খেলায় পা ধরে মাটিতে ফেলার কোনো সুযোগ নেওয়া না গেলেও শাহজালাল বারবার সে সুযোগ নিয়েছেন। কিন্তু রেফারি তাতে বাধা দেননি।

এ বিষয়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে এই খেলা পরিচালনাকারী এমএ মালেক বলেন, “জীবন বারবার মাটিতে বুক লাগিয়ে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তাই তাকে কয়েকবার সতর্ক করার পরও সে সুধরে উঠছিল না। তাই পয়েন্ট নির্ধারণ করে জয়-পরাজয় ঠিক করা হয় “

খেলায় চ্যাম্পিয়ন শাহজালালকে ক্রেস্ট ও নগদ ২০ হাজার টাকা এবং রনার্স আপ জীবনকে ক্রেস্ট ও নগদ ১৫ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হয়। এছাড়াও প্রথম রাউন্ডে জয়ী সবাইকে ক্রেস্ট ও নগদ এক হাজার টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হয়।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মাহাবুবর রহমান পুরস্কার বিতরণ করেন।

জয়ের পর শাহজালাল বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “কুস্তি খেলেই তার জীবন চলে। বাংলাদেশ আনসারের হয়ে বিভিন্ন স্থানে খেলেন। আবার ব্যক্তিগতভাবেও খেলেন দেশের বিভিন্ন স্থানে।

দুই সন্তানের জনক শাহজালাল বলেন, ঘর চলে আনসারের থেকে পাওয়া ভাতা দিয়ে। আর সব সময় নিয়ম করে অনুশীলন করেন তিনি।

শখের বশে বলী খেলায়

চট্টগ্রামের লালদিঘী ময়দানে বৃহস্পতিবার জব্বারের বলী খেলায় বিজয়ী কুমিল্লার শাহজালাল তার প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করার একটি মুহূর্ত। ছবি: সুমন বাবু

এবারের খেলায় নবীন বলীরা যেমন অংশ নিয়েছেন, তেমনই ছিলেন প্রবীণরা।

প্রতিবারের মতো ষাঠোর্ধ্ব হাটহাজারীর মফিজ এবং পতেঙ্গার খাজা আহম্মদও ষাট বছর পেরিয়ে অংশ নিয়েছেন বলী খেলায়। অংশ নিয়েছে স্কুলপড়ুয়া কিশোরও।

চট্টগ্রাম রেলওয়ে স্টেশন কলোনী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র মো. ইব্রাহিমও অংশ নিয়েছিলেন প্রথম রাউন্ডের খেলায়।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “প্রতিবছর অনেককে খেলতে দেখেছি। তাই এবার আমিও শখ করে আসলাম এ আসরে।”

একইভাবে রাঙ্গামাটি থেকে এসেছেন রুবেল হোসেন। পেশায় দলিল লেখক রুবেলও জানান, শখ করে বলী খেলতে আসার কথা।  

এ বছর আব্দুল জব্বারের বলী খেলার ১১০তম আসরে স্পন্সর করেছে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে দেশের যুব সমাজকে সংগঠিত করতে ১৯০৯ সালে স্থানীয় আব্দুল জব্বার সওদাগর লালদিঘী মাঠে আয়োজন করেন কুস্তি প্রতিযোগিতা। পরে তা আব্দুল জব্বারের বলীখেলা নামে পরিচিত হয়, যার জনপ্রিয়তা এখনও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

বাংলা পঞ্জিকা অনুসারে ১২ বৈশাখে লালদিঘীর ময়দানে অনুষ্ঠিত হয় এই খেলা, খেলার আগের দিন থেকে শুরু করে পরদিন পর্যন্ত তিন দিন লালদিঘীর মাঠ ও আশপাশের কয়েক কিলোমিটার জায়গাজুড়ে বসে বৈশাখী মেলা।

মেলায় বিভিন্ন ধরনের পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা দোকানিরা।