ঢাকা, মঙ্গলবার, ২১ মে ২০১৯, ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

দিল্লিবাসীর ভোট ভাবনায় নানা অংক

http://bangla.bdnews24.com/neighbour/article1623206.bdnews
BY  সুমন মাহমুদ, দিল্লি থেকে  বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published: 16 May 2019 10:01 AM BdST Updated: 16 May 2019 10:40 AM BdST

অনেকের ধারণা, কংগ্রেস এবারও বিশেষ সুবিধা করতে পারবে না। বিজেপির নেতৃত্বে শরিকদের নিয়ে সরকার হবে। আবার কারো কারো মত হল- আঞ্চলিক দলগুলো হয়ে উঠতে পারে নির্ণায়ক।

নয়া দিল্লি, পূর্ব দিল্লি, পশ্চিম দিল্লির নানা পেশার মানুষের সাথে আলাপচারিতায় এমন ধারণার কথাই উঠে এসেছে।

দিল্লির সিআর পার্কের বাসিন্দা অধ্যাপক সুতীশ গোয়েল রাজনীতির খোঁজ খবর রাখেন নিয়মিত। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি বলেন, “গোটা ভারতে লোকসভার ভোটের যে ট্রেন্ড এ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে- বিজেপি গতবারের মত একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। তাহলে অংকটা জটিল।

“আমার হিসাব-নিকাশ বলে, এককভাবে কোনো দলের পক্ষে এবার সরকার গঠন করা খুব কঠিন হবে। যে দল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনের কাছাকাছি আসন পাবে তাকেই আঞ্চলিক দলগুলোর সাথে সমঝোতায় এসে সরকারে বসতে হবে।”

দিল্লির সাউথ এশিয়ান ইউনির্ভাসিটির ছাত্র কল্যাণ ব্যানার্জী বলেন, “ভোটের শেষ পর্যায়ে এসে রাজনৈতিক দলগুলো খুব টেনশনে আছে। বিশেষ করে বিজেপি ও কংগ্রেস। আমরা যারা রাজনীতি নিয়ে কিছুটা খোঁজ-খবর রাখি, তারাও কিন্তু খুব একটা স্বস্তিতে নেই। এবার উত্তর প্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, তামিলনাড়ু, বিহার রাজ্যের প্রধান আঞ্চলিক দলগুলো খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে বলে মনে হচ্ছে।”

ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে ৫৪৩ আসনের মধ্যে ইতোমধ্যে ৪৮৪ আসনের ভোটগ্রহণ শেষ হয়েছে। বাকি ৫৯ আসনের ভোট হবে শেষ পর্বে আগামী ১৯ মে। এর তিনদিন পর ২৩ মে দিল্লীতে একসঙ্গে ভোট গণনা করে সেদিনই ফলাফল ঘোষণা করবে নির্বাচন কমিশন।

দিল্লিতে কংগ্রেস ও বিজেপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতারা সারা দেশের ভোটের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছেন। গণমাধ্যমের সাথে তারা কোনো কথা বলছেন না।

ভোটের শেষ প্রান্তে এসে পরবর্তী কর্মকৌশল নিয়ে অনানুষ্ঠানিক সম্ভাব্য প্রস্তুতিও নিচ্ছে কেন্দ্রের শীর্ষ রাজনৈতিক দলগুলো।

‘ক্ষমতাধর আঞ্চলিক ১২ নেতা’

নানা কারণে ভারতের কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক দলগুলোর বলয় থেকে এবার আঞ্চলিক নেতাদের গুরুত্ব বেড়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন উত্তর প্রদেশের বহুজন সমাজ পার্টির ময়াবতী, সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাবদ, পশ্চিম বঙ্গের তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অন্ধ্র প্রদেশের তেলেগু দেশম পার্টির (টিডিপি) চন্দ্র বাবু নাইডু, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতির কে চন্দ্র শেখর রাও, তামিলনাড়ুর ডিএমকের এম কে স্ট্যালিন, মহারাষ্ট্রের এনসিপির শারদ পাওয়ার, দিল্লীর আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরিওয়াল, কর্ণাটকের জনতা দলের (ধর্মনিরপেক্ষ) এইচ ডি কুমারস্বামী, ওড়িশার জনতা দলের নবীন পট্টনায়েক, কেরালার এলডিএফ এর পিনারাই বিজয়ন ও বিহারের জনতা দলের (সংযুক্ত) নীতিষ কুমার।

তাদের মধ্যে, মায়াবতী, চন্দ্র বাবু নাইড়ু ও কে চন্দ্র শেখর রাও চাইছেন একটি বিরোধী জোট হোক। সেই লক্ষ্যে তারা কংগ্রেসের সাথে যোগাযোগও রক্ষা করছেন দীর্ঘদিন ধরে। তবে এই আঞ্চলিক জোটের নামকরণ কিংবা ধরণ-কাঠামো এখনো স্পষ্ট নয়।

দিল্লি গেইটের বিশাল প্রাঙ্গণে কথা হয় নয়া দিল্লির কেরলবাগের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা অদিত্য সেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, “আমার কেমন জানি মনে হচ্ছে, আঞ্চলিক দলগুলোর যে সংগঠিত শক্তি দেখছি, তারা একজোট হয়ে তৃতীয় কোনো একটি ফ্রন্ট গঠন করতে পারে। সেক্ষেত্রে অবশ্যই বড় একটি দলের সমর্থন লাগবে।

“আমি মনে করি কোনো দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে ভারতে ওই দুই দল অর্থাৎ বিজেপি ও কংগ্রেসের বাইরে ‘অ-বিজেপি’ অথবা ‘অ-কংগ্রেস’ সরকারও হতে পারে। ভোটের ফলাফল কী হয় তার উপরই নির্ভর করবে সব কিছু। সেই প্রতীক্ষায় আমাদের থাকতে হবে কয়েকটি দিন।”

‘তৃতীয় ফ্রন্ট অথবা ফেডারেল ফ্রন্টের চিন্তা’

ভোটের হিসাব নিকাশে নানা সমীকরণ নিয়ে এগুচ্ছে বিরোধী জোট। তৃতীয় ফ্রন্টের একটা চিন্তাও তাদের রয়েছে। আঞ্চলিক রাজ্যের, বিশেষ করে অন্ধ্রপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা, পশ্চিমবঙ্গ, উত্তর প্রদেশ, উড়িষ্যা, দিল্লির বিরোধী নেতাদের নিয়েই এ ফ্রন্ট হতে পারে।

এক বছর আগেই এ রকম তৃতীয় ফ্রন্ট গঠনের চিন্তা নিয়ে কাজ শুরু করেছেন অন্ধ্রপ্রদেশের কে চন্দ্র শেখর। তার সঙ্গে আছেন মহারাষ্ট্রের বর্ষিয়ান রাজনীতিবিদ এনপিপির শারদ পাওয়ার।

লোকসভা নির্বাচন শুরু আগেই তিনি গণমাধ্যমকে বলেছেন, “আমার ধারণা বিজেপি এবার ১৫০টির বেশি আসনে জিততে পারবে না। কংগ্রেসও ১০০ পেরুতে পারবে না। সেজন্য আমরা দেশে একটি বাস্তব ফেডারেল ফ্রন্ট গঠনের চেষ্টা চালাচ্ছি।”

শারদ পাওয়ারের এই উদ্যোগকে ‘ম্যাজিক’ অভিহিত করে নয়া দিল্লির সিআর পার্কের চিকিৎসক এস দাস চৌধুরী বলেন, “তৃতীয় ফ্রন্ট বলুন অথবা আঞ্চলিক দলগুলোকে নিয়ে ফেডারেল ফ্রন্টই বলুন, তাদেরকে সরকার গঠন করতে হলে অবশ্যই কংগ্রেসের সমর্থন পেতে হবে।

‘‘এখানে সব চেয়ে বড় জটিলতা ওইরকম ফ্রন্টের নেতা কে হবেন? প্রধানমন্ত্রী কে হবেন? কংগ্রেস তাদের বাইরে প্রধানমন্ত্রী পদে অন্য কাউকে মেনে নেবে কিনা- এসব দেখার বিষয়।”

পুরনো দিল্লির পাহারগঞ্জের হোটেল-রেস্তোরাঁয় মানুষজনের মুখে মুখে সম্ভাব্য বিরোধী জোট নিয়ে নানা কথা আসছে।

একটি কিন্ডার গার্টেন স্কুলের শিক্ষিকা কাবেরী ব্যানার্জি বলেন, ‘‘ধরুন, বিজেপি এবার একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। সেক্ষেত্রে তাকে তো তার শরিকদের নিয়ে সরকার গঠন করতে হবে। আবার আঞ্চলিক দলগুলোর ফলাফল ভালো হলে কংগ্রেসের নেতৃত্বে বিরোধী জোটের সম্ভাবনা আছে। যদি তারা ঐকমত্যে আসতে পারেন।

“কিন্তু আমি মনে করি, এবার কংগ্রেসও বেশি আসন পাবে না। সেক্ষেত্রে বিজেপিকে ঠেকাতে তাদের উচিত হবে তৃতীয় ফ্রন্ট গঠন করে তাদেরকে সরকার গঠনে সমর্থন দেওয়া।”

‘কংগ্রেসের আগাম প্রস্তুতি’

কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী দিল্লিতেই অবস্থান করছেন। দিল্লির পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে, ভোটের ফলাফল ঘোষণার পরদিনই পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দোপাধ্যায়, উত্তর প্রদেশের মায়াবতী, অখিলেশ যাদব, তেলেঙ্গানার কে চন্দ্র শেখর রাওসহ আঞ্চলিক দলের নেতাদের দিল্লিতে চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গান্ধীর মা সোনিয়া।

ভোটের ফলাফল ঘোষণার আগেই কংগ্রেসের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে আঞ্চলিক শীর্ষ নেতা-নেত্রীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য, একটা বৃহত্তর বিরোধী জোট গঠন করা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ২০০৪ ও ২০০৯ সালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে ‘ইউনাইটেড পিপলস এলায়েন্স-ইউপিএ’ সরকার গঠনে সোনিয়া গান্ধী গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা ছিল। তিনি প্রধানমন্ত্রী না হয়ে মনমোহন সিংকে প্রধানমন্ত্রী করেছিলেন দুইবার।

‘বিজেপির সর্তক অবস্থান’

বিজেপি নেতারা হোম ওয়ার্ক করছেন। সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পেলে কী করা যায় তার সম্ভাব্য কৌশলও তারা খসড়া করে রাখছেন বলে স্থানীয় পত্রিকার খবর। নরেন্দ্র মোদীও শেষ সময়ের প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন।

পূর্ব দিল্লির একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের মালিক এস এ ভট্টাচার্য্য বলেন, “আমি যতটুকু ভাবছি- তোড়-জোড় যাই হোক, সমীকরণ যাই বলুন, বিজেপিই আবার সরকার গঠনের সুযোগ পাবে। তবে এবার বিজেপি মার্জিনাল ভোটেই সরকারে আসবে।

“তবে ভিন্ন কিছু ঘটবে কি না তা আঞ্চলিক দলগুলো একজোট হতে পারার ওপর নির্ভর করছে। মায়াবতী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, চন্দ্র শেখর নাইডুর মত বাঘা বাঘা নেতারা আছেন, তাদের কে প্রধানমন্ত্রীর পদ ছাড়তে চাইবেন? ফলে ঝামেলা আছে, সমঝোতা অনিশ্চিত।”

২০১৪ সালে ভারতের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছিল। তারা পায় ২৮২ আসন। আর বিজেপি জোট পায় ৩৩৪টি আসন। অপর দিকে কংগ্রেস পেয়েছিল শুধু ৪৪টি আসন। জোটে তারা পায় ৬০টি আসন। অন্যান্যরা পায় ১৪৯টি আসন।