ঢাকা, বুধবার, ১৮ জুলাই ২০১৮, ৩ শ্রাবণ ১৪২৬

পাইলট স্বামীর মৃত্যু সংবাদ শুনে স্ত্রীর সিভিয়ার স্ট্রোক

http://www.ittefaq.com.bd/capital/2018/03/20/151087.html
BYআবুল খায়ের
২০ মার্চ, ২০১৮ ইং ১০:৪৪ মিঃ

‘শেষ ফ্লাইট পরিচালনার আগে ছেলেকে দেখে রাখাসহ সংসার পরিচালনার সার্বিক নির্দেশনা দিয়ে যান নেপালের কাঠমান্ডুতে বিধ্বস্ত ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের উড়োজাহাজটির প্রধান বৈমানিক আবিদ সুলতান। অতীতে কখনো তিনি এমন কথা বলেননি। হয়তো তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এটাই তার পরিবারের সঙ্গে শেষ কথা।’ ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালে চিকিৎসাধীন আবির সুলতানের স্ত্রী আফসান টপির স্বজনরা ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে এমন কথা বলেন। স্বামীর মৃত্যুর খবর শুনে মানসিকভাবে ভীষণ ভেঙ্গে পড়েন আফসান টপি। আর মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ার প্রেক্ষিতে সিভিয়ার স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে আফসান টপি এখন মৃত্যুর পথযাত্রী। তার বয়স ৪০ বছর। একমাত্র ছেলে ‘ও’ লেভেলে পড়েলেখা করে। আবিদ সুলতানের শোকার্ত স্ত্রী আফসানা টপির অবস্থা এখন আশঙ্কামুক্ত নয়। তার চিকিৎসায় ৭ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছে। এ বোর্ডের প্রধান ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের পরিচালক অধ্যাপক ডা. দীন মোহাম্মদ। বর্তমানে আফসানা টপির লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছে। তার ব্রেনে ফাংশন আসছে না। কৃত্রিম উপায়ে (মেশিনের সাহায্যে) শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন টপি। তবে তার কিডনি, লিভার, হার্ট সচল রয়েছে। রক্তের চাপ বেশি থাকায় তার মাথার খুলি খুলে রেখে বাঁচিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাচ্ছেন চিকিত্সকরা বলে জানান ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের যুগ্ম পরিচালক অধ্যাপক ডা. বদরুল আলম। তিনি বলেন, রক্ত চাপ কমলে তার মাথার খুলি লাগিয়ে দেওয়া হবে। অধ্যাপক বদরুল আলম বলেন, ‘আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করছি। তার চিকিত্সার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আজ মঙ্গলবার দ্বিতীয় দফায় মেডিকেল বোর্ড বসবেন। আফসানা টপি রবিবার ব্রেন স্ট্রোক করলে প্রথমে তাকে উত্তরার একটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। অবস্থার অবণতি হলে রাত ১০টায় তাকে ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব নিউরো সায়েন্সেস অ্যান্ড হসপিটালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। রাত ২টা পর্যন্ত অপারেশন চলে। চিকিত্সকরা জানান, তারা আফসানাকে লাইফ সাপোর্টে পর্যবেক্ষণে রেখেছেন। কিন্তু উন্নতির তেমন কোনো লক্ষণ এখনও দেখেননি। এদিকে আবিদের স্বজনরা বলেন, নেপালে বিমান বিধ্বস্তে নিহত কো-পাইলট পৃথুলার অনুরোধে আবির পাইলট হিসেবে নেপালে যান। তার চাকরি হয়েছিল ইথিওপিয়ায় একটি বেসরকারি বিমানে। পৃথুলা ছিলেন আবিরের ছাত্রী। ইউএসবাংলার কর্তৃপক্ষের পাশাপাশি ছাত্রীর অনুরোধে নেপালে যাওয়া শেষ উড়োজাহাজটি পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেন আবির। আবিদের বন্ধু মাহিম হোসেন বলেন, ‘আমার স্ত্রী হাসপাতালে গিয়ে আজ ভাবিকে দেখে এসেছে। তার অবস্থা আরও ক্রিটিক্যাল হয়েছে। তবে ফাইনাল কমেন্ট এখনও করেননি চিকিৎসক।’ আবিদের ভাই মাহমুদ খুরশিদও একজন চিকিৎসক। গতকাল সোমবার দুপুরে নেপাল থেকে নিহতদের মরদেহ দেশে আনার আগে আগে ইউএস-বাংলার আরেকটি ফ্লাইটে অন্য স্বজনদের সঙ্গে তিনিও দেশে ফিরেছেন। ৭১ জন আরোহী নিয়ে ঢাকা থেকে রওনা হয়ে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ১২ মার্চ দুপুরে বিধ্বস্ত হয় ইউএস-বাংলার ড্যাশ উড়োজাহাজটি। এতে ৫১ জনের মৃত্যু হয়। তাদের মধ্যে চার ক্রুসহ ২৬ জন ছিলেন বাংলাদেশি। দুর্ঘটনার পর ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, ক্যাপ্টেন আবিদ আহত অবস্থায় হাসপাতালে আছেন। পরদিন সকালে নেপালের একটি হাসপাতালে চিকিত্সাধীন অবস্থায় ক্যাপ্টেন আবিদ সুলতানের মৃত্যুর খবর পান স্ত্রী। আবিদের এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু জানান, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে প্রথম মৃত্যু সংবাদটি শুনে কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারছিলেন না আফসানা টপি। অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলেন। পরে তিনি বেঁচে আছেন জেনে একটু স্বাভাবিক হন। কিন্তু পরদিন যখন জানতে পারলেন স্বামী মারা গেছেন, তারপর থেকে তিনি একেবারেই ভেঙে পড়েছিলেন। আসলে এত বড় শোক সহ্য করতে পারেননি। আফসানার আত্মীয় শামীমা নার্গিস বলেন, গত কয়েকদিন যাবত্ তিনি সুস্থই ছিলেন। তবে রবিবার ভোরে তিনি ফোন করে দ্রুত বাসায় যেতে বলেন শামীমাকে। বাসায় যাওয়ার পর দেখতে পান আফসানা কথা বলতে পারছেন না, হাত-পা নেতিয়ে পড়েছে। জানা গেছে, আফসানার বিষয়ে আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টায় ব্রিফিং করবেন সিনিয়র চিকিত্সকরা। তার চিকিত্সায় গঠিত মেডিক্যাল বোর্ডের একজন সদস্য জানান, আফসানার বাঁচার সম্ভাবনা মাত্র দুই শতাংশ।