ঢাকা, শনিবার, ২১ জুলাই ২০১৮, ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

‘চুম্বকে আটকে ইয়াবা পাচার, নারকেলে ভরে বিক্রি!’

https://www.jagonews24.com/national/news/439361
BYনিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম প্রকাশিত: ১১:০৭ এএম, ১৩ জুলাই ২০১৮ | আপডেট: ১১:০৮ এএম, ১৩ জুলাই ২০১৮

দেশব্যাপী মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে প্রতিদিনই চট্টগ্রামে প্রবেশ করছে ইয়াবার ছোট-বড় চালান। এক্ষেত্রে গ্রেপ্তার এড়াতে প্রতিনিয়ত কৌশল বদলাচ্ছে মাদক পাচারকারীরা। এক কৌশল ধরা পড়ে গেলে ব্যবহার করা হচ্ছে আরেক কৌশল। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে নেয়া কৌশলগুলো ক’দিন পরেই অভিযানে বা তল্লাশিতে ধরা পড়ছে। সর্বশেষ গত ১২ দিনে চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচার ও বেচাকেনার নিত্য নতুন কৌশল দেখে হতবাক হয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও।

নারকেলের ভেতর ইয়াবা

বৃহস্পতিবার (১২ জুলাই) চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানার ফিরিঙ্গি বাজারে একটি রেস্টুরেন্টের সামনের রাস্তা থেকে মো. ইদ্রিস (৩১) নামের এক যুবককে গ্রেফতার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। তিনি এক অভিনব পদ্ধতিতে ইয়াবা বিক্রি করছিলেন।

চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের সহকারী পুলিশ কমিশনার কাজল কান্তি চৌধুরী জাগো নিউজকে বলেন, ‘অপরাধীদের অপরাধ প্রক্রিয়া যে কত বিচিত্র হতে পারে, তার নিদর্শন হলো আজকের (বৃহস্পতিবার) ইয়াবা উদ্ধারের ঘটনাটি। মহানগর গোয়েন্দা বিভাগের একটি দল যখন গোপন সূত্রে নারকেলের ভেতর ইয়াবা পরিবহনের সংবাদটি পায়, তখন মোটামুটি সবাই নড়েচড়ে বসেন। তিনটি নারকেলের ভেতর এমনভাবে ইয়াবাগুলো রাখা ছিল, উপর থেকে দেখে বুঝার কোনো উপায় ছিল না।’

গ্রেফতারকৃত আসামি মো. ইদ্রিসের বরাত দিয়ে তিনি জানান, কক্সবাজারের টেকনাফের আব্দুর শুক্কুর নামে এক ইয়াবা ব্যবসায়ী নারকেলের ভেতরে সুকৌশলে ইয়াবা লুকিয়ে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে আসেন। পরে ইদ্রিসকে এই অভিনব পদ্ধতিতে ইয়াবা বিক্রির কৌশল শিখিয়েছেন শুক্কুর।

চুম্বক আটকে আসছে ইয়াবা

ইয়াবা পাচারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে পাচারকারীরা নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছে। যার অনেক কৌশল পুরনো হয়ে গেছে। কিন্তু এবার এমন এক কৌশলে ইয়াবা পাচার ধরা পড়ল, যা আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে পড়েনি। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক পথে ইয়াবা পাচারেও পুলিশের হাতে যারা ধরা পড়ছে অভিনব কায়দা। গাড়ির চাকা ও চেসিসের আশপাশের জায়গায় কৌশলে ইয়াবা লুকানো হয়েছে। এতে ব্যবহার করা হয়েছে চুম্বক কৌশল।

এ ধরনের একটি ঘটনায় পাঁচ হাজার ইয়াবা জব্দ করেছে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। বুধবার (১১ জুলাই) ভোররাতে শাহ আমানত সেতু এলাকায় হানিফ পরিবহনের একটি বাসে এ অভিযান চালানো হয়। এ সময় বাসের চালক জাহিদ গাজী, হেলপার শিহাব উদ্দিন ও সুপারভাইজার বাশারকে গ্রেপ্তার করা হয়।

চুম্বক কৌশলের বিষয়টি জানিয়ে নগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী কমিশনার (বন্দর) আসিফ মহিউদ্দিন জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইয়াবার প্যাকেটগুলোর সঙ্গে বাড়তি প্যাকেট মোড়ানো হয়েছে। সঙ্গে চুম্বক ব্যবহার করা হয়েছে। এরপর প্যাকেটগুলো বাসের নিচে চাকার কাছে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, প্যাকেটগুলোতে এমনভাবে চুম্বক ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে চলন্ত গাড়ির ঝাঁকুনির সময়ও ইয়াবা পড়ে না যায়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ অভিযান চালানো হয়। অতীতে চুম্বক কৌশলের মাধ্যমে ইয়াবা পাচারের ঘটনা ধরা পড়েনি।’

দেয়াল ঘড়ির ভেতর ইয়াবা

চলতি মাসের শুরুতে (১ জুলাই) চট্টগ্রাম নগরের শাহ আমানত সেতু এলাকা থেকে বোরহান উদ্দিন (৩২) নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। এ সময় তাকে তল্লাশি করে সঙ্গে থাকা একটি দেয়াল ঘড়ির ভেতর থেকে ৭ হাজার ২০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

নগর গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক হুমায়ুন কবির জাগো নিউজকে বলেন, ‘ইয়াবাগুলো অভিনব কায়দায় ঘড়ির ভেতর টেপ দিয়ে মোড়ানো অবস্থায় ছিল।’

গ্রেফতার হওয়া বোরহান উদ্দিনের বরাত দিয়ে হুমায়ুন কবির জানান, কক্সবাজারের অপু আহম্মদ অপু নামে এক ইয়াবা ব্যবসায়ী দেয়াল ঘড়ির ভেতরে সুকৌশলে ইয়াবা লুকিয়ে চট্টগ্রাম শহরে নিয়ে আসে। পরে তাকে এই অভিনব পদ্ধতিতে বিক্রির জন্য দিয়েছে।

উপরের তিনটি ঘটনাতেই ইয়াবার ছোট ছোট চালান কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রামে প্রবেশ করেছে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়ক হয়ে ও নগরীর অন্যতম প্রবেশদ্বার শাহ আমানত সেতু ব্যবহার করে।

এক সময় নগরের বাকলিয়া থানার অধীনে থাকা শাহ আমানত সেতু এলাকা বর্তমানে কর্ণফুলী থানার অধীনে। তবে কয়েক বছর আগে বাকলিয়া থানায় দায়িত্ব পালন করা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসীন জাগো নিউজকে জানান এ রুটে ইয়াবা পাচার নিয়ে তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা।

মোহাম্মদ মহসীন জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমি বাকলিয়া থানার ওসি থাকাকালীন কর্ণফুলী শাহ আমানত সেতু চেক পোস্টে যানবাহনে তল্লাশি চালাতে গিয়ে দেখেছি, কতভাবে ইয়াবা পাচার করছে অপরাধীরা। উদাহরণ দিতে গিয়ে তিনি বলেন, বেশ কয়েক বছর আগে আব্দুল আউয়াল নামে একজনের ল্যাপটপে তল্লাশি চালিয়ে তিনশ’ পিস ইয়াবা পেয়েছিলাম। শুধু তাই নয়, জুতার তলায়, ছাতার ভেতর, চানাচুরের প্যাকেটে, আসবাবপত্রের জয়েন্টে, গাড়ির বিভিন্ন অংশে, এলপি গ্যাস সিলিন্ডারে, সুপারির ভেতর, ক্যামেরায়, মোবাইল সেটে এমনকি নারীদের গোপনাঙ্গ ও পুরুষের পায়ুপথ ব্যবহার করেও ইয়াবা পাচারের ঘটনাও ঘটেছে।’

এসআর/এমএস