ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

অরিত্রির ‘নকল’ ও আমাদের দায়বদ্ধতা

https://www.jagonews24.com/opinion/news/467557
BYশাম্মী আক্তার শাম্মী আক্তার প্রকাশিত: ১২:২৩ এএম, ০৭ ডিসেম্বর ২০১৮

অরিত্রিকে কেন আত্মহত্যা করতে হলো? তার পেছনের কারণ যদি আমরা খুঁজতে যাই তাহলে আগে খুঁজতে হবে, জানতে হবে অরিত্রিকে কেন নকল করতে হলো? আমার কাছে নিম্নবর্ণিত বিষয়সমূহ এক ধরনের অনুঘটক হিসেবে মনে হচ্ছে।

১. অতি প্রত্যাশা

সমকালীন অতি প্রত্যাশা এক ধরনের নীরব ঘাতক হিসেবে আমাদের সন্তানের ওপর প্রভাব ফেলছে। আমাদের সমাজে দেখা যায় বাবা-মায়েরা তাদের নিজেদের আত্মতুষ্টির জন্য, তাদের সামাজিক মানরক্ষার জন্য সন্তানদের সাথে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে জড়িয়ে পড়ে। ফলশ্রুতিতে সন্তানরা যখন বাবা-মায়ের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জন করতে ব্যর্থ হয় তখন তারা বিভিন্ন রকমের হতাশায় ভোগে এবং অনেক সময় বিভিন্ন ধরনের অসদুপায়ও অবলম্বন করতে উদ্যত হয়। এ ধরনের চলমান রেসের জন্য তাদের জীবন গাড়ি কখনো থামে না! তাদের জীবনে স্বস্তি নেই, ছন্দ নেই! এখনো আমার মনে পড়ে আমরা যখন স্টুডেন্ট ছিলাম তখন অন্তত ডিসেম্বর মাসটা আমরা নিজেদের মতো করে উপভোগ করতাম। কিন্তু এখন সবাই যেন রেসে আছে। একে-অন্যকে ছোঁয়ার প্রতিযোগিতা, একে-অন্যকে পেছনে ফেলার প্রতিযোগিতা। শুধু প্রতিযোগিতা আর প্রতিযোগিতা! এ এক প্রতিযোগিতাময় জীবন!

২. বইয়ের অতিরিক্ত বোঝা

বইয়ের বোঝা কমানোর ব্যাপারে মহামান্য হাইকোর্টের আদেশ কতটুকু মান্য করা হয় এটা নিয়ে মনে হয় সবার মনেই একটা কোশ্চেন মার্ক রয়ে গেছে!! আমি মনে করি এখন সময় এসেছে আমাদের সিলেবাসগুলোর দিকে একটু নজর দেয়ার। যেসব স্বল্প প্রয়োজনীয় বা অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট রয়েছে সেগুলো কাটছাঁট করার সময় এসেছে। সিলেবাসের কনটেন্ট কমানোর মাধ্যমে সন্তানদের জীবন উপভোগের একটু সুযোগ, সময় তৈরি হবে। এ কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই যে ইন্টেলিজেন্স কোশেন্টের (আইকিউ) পাশাপাশি ইমোশনাল কোশেন্ট (ইকিউ) বা ইমোশনাল ইন্টেলিজেন্সের গুরুত্ব এবং প্রভাব ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক জীবনে অনেক যা অর্জন করতে হলে পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে আরও অনেক সৃজনশীল কাজের সাথে যুক্ত থাকা প্রয়োজন।

৩. ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের অনুপাত ঠিক না থাকা

আমাদের দেশে এই প্র্যাকটিজটা মনে হয় খুব একটা ভালো নেই। ছাত্র-ছাত্রীর অনুপাত অনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেয়া জরুরি। প্রত্যাশা করি আমাদের শিক্ষাবান্ধব সরকার বিষয়টি আমলে নেবেন এবং তদনুযায়ী শিক্ষক নিয়োগ দেবেন। অর্থাৎ যদি ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকদের অনুপাত ভালো থাকে তাহলে দেখা যাবে ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষকের সান্নিধ্য পাওয়ার ভালো সুযোগ তৈরি হবে। যেমন প্রথম থেকেই যদি এটা ঠিক করে দেয়া হয় যে ১০ জন বা ১৫ জন ছাত্র-ছাত্রী জন্য একজন করে শিক্ষক এক্সক্লুসিভলি এবং ডেডিকেটলি মেন্টরের দায়িত্ব পালন করবেন। তাহলে দেখা যাবে ছাত্র-ছাত্রী ও শিক্ষকের মধ্যে একটা সুন্দর সম্পর্ক তৈরি হবে। পাশাপাশি তারা তাদের সমস্যা নিয়ে শিক্ষকদের সাথে কথা বলার সুযোগ ও সময় পাবে। এতে করে যদি কোনো সমস্যা থেকেও থাকে তাহলে সেটা সমাধান করা সহজ হবে।

৪. মাত্রারিক্ত পরীক্ষা

ছাত্র-ছাত্রীদের এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজের দিকে মনযোগী করে তোলার জন্য, তাদের মানসিক সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য, তাদের মানসিক প্রশান্তির জন্য, সর্বোপরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মান উজ্জ্বল করার জন্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য পরীক্ষার সংখ্যা কমানো একটা অতীব জরুরি বিষয় বলে মনে করি। পুঁথিগত বিদ্যাই কি সব? অবশ্যই না! যখনই আমরা শুধু পুঁথিগত বিদ্যার ফল আশা করি তখনই আসলে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা তৈরি হয়। কারণ শুধু পুঁথিগত বিদ্যার মাধ্যমে কোনো মানুষই পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে তৈরি হতে পারে না।

৫. সৃজনশীল পরিবেশের অভাব

সমস্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কমবেশি সৃজনশীল পরিবেশের অভাব রয়েছে। প্রথমে ভেবেছিলাম আমার মেয়েকে এবার প্লে গ্রুপে ভর্তি করাবো। ওর চার বছর হয়েছে। কিন্তু একটি বিষয় ভেবে আবার জোরেশোরে পিছিয়ে এলাম। তা হচ্ছে আসলে দেখা যায় আমরা প্লে ভেবে ছেলেমেয়েদেরকে স্কুলে তাড়াতাড়ি ভর্তি করিয়ে দিই যাতে করে তারা খেলার মাধ্যমে, আনন্দের সাথে একটি সুন্দর পরিবেশে কিছু শিখতে পারে। কিন্তু বাস্তব চিত্রে তার উল্টোটা দেখা যায়। খেলা হয় তবে সেটা খুব যৎসামান্য। খেলা বাদে প্লে অর্থাৎ খেলা করা শ্রেণি হয়ে যায় পুরোপুরি "পড়াশোনার শ্রেণি"।

সমস্ত জায়গায় রেজাল্টভিত্তিক এক তুমুল প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা যায়। এখানে সন্তানদের আলাদা ক্ষেত্রে মেধা বিকাশের জন্য তেমন কোনো প্রতিযোগিতা কিন্তু তেমন হয় না। পড়াশোনা বাদেও আমরা আরও অন্যান্য বিষয় যেমন খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক চর্চা, বিতর্ক, অঙ্কন প্রতিযোগিতা ইত্যাদির মাধ্যমে ছেলে মেয়েদেরকে আমরা উদ্বুদ্ধ করতে পারি। এতে দেখা যাবে শুধু রেজাল্টভিত্তিক প্রতিযোগিতা না করে ছেলেমেয়েরা কেউ অঙ্কনে সেরা হতে চাইবে, কেউ খেলাধুলায় সেরা হতে চাইবে, কেউ সংগীতে সেরা হতে চাইবে, কেউ বিতর্কে সেরা হতে চাইবে, কেউ নেতৃত্বে সেরা হতে চাইবে, কেউ স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে হতে চাইবে এবং আরও অনেক বিষয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আমরা উদ্বুদ্ধ করতে পারি। এভাবে দেখা যাবে যখন অনেক অনেক প্লাটফর্ম তৈরি করা হবে তখন তারা আপন মহিমায় উদ্ভাসিত হবে এবং সবাই কোনো না কোনো বিষয়ে সেরা হয়ে যাবে।

৬. সন্তানদের সক্ষমতা না বুঝা

আমরা সবাই জানি, সবার মানসিক, শারীরিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সমান হয় না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে দেখা যায় আমাদের সবার প্রত্যাশা প্রতিযোগিতামূলক! তা হলো যে করেই হোক প্রথম, দ্বিতীয় বা তৃতীয় অবস্থান। হতে পারে তা অতিরিক্ত সংখ্যক প্রাইভেট টিউটর দিয়ে, কোচিংয়ের সাথে যুক্ত করে, বা অন্য কোনো উপায়ে আমরা সবাই ওই একটা জিনিস এর স্বাদ নিতে চাই। এগুলো ছাড়া বাকি সব ফিকে, মূল্যহীন! আজব মানসিকতা! আমাদের তো আমাদের সন্তানের ক্যাপাসিটি বা এবিলিটি সম্পর্কে বুঝতে হবে। তাদের ধারণ ক্ষমতা সম্পর্কে জানতে হবে এবং সে অনুযায়ী আমাদের প্রত্যাশার মাপকাঠি ঠিক করতে হবে। তা না হলে দেখা যাবে এই অসুস্থ প্রতিযোগিতা শুধু সন্তানেরদেরই অসুস্থ করবে না আমাদেরকেও অসুস্থ করে দেবে।

৭. সন্তানদের নিজস্বতায় ব্যাঘাত করা

আমার পঞ্চম শ্রেণিতে পড়া এক ভাতিজা আছে; অরন। ওর প্রথম থেকেই দেখি পড়াশোনায় তেমন মনোযোগ নাই। মনের ভেতর কেমন যেন অন্যরকম একটা ইচ্ছা বিচরণ করে এটা বোঝা যায়। কিছুদিন ধরে আমি ওকে একটু লক্ষ্য করছি। তারপরে যেটা বুঝতে পারলাম তা হচ্ছে ওর পড়াশোনার প্রতি আকর্ষণ একটু কম কিন্তু অন্য আরেকটি বিষয়ে তার অতিব আকর্ষণ অর্থাৎ তার ধ্যান-জ্ঞানই সেটা। তা হচ্ছে সে ছোট ছোট করে বিভিন্ন ধরনের ইলেকট্রনিক্সের জিনিসপত্র তৈরি করতে খুব পছন্দ করে। তাই আমি বাসায় একদিন বলেই দিলাম যে সে পড়াশোনাটা তার মতো করে চালিয়ে যাক। খুব বেশি প্রেসার দিয়ে তাকে নাস্তানুবাদ করার দরকার নাই। যেভাবে চলছে সেভাবেই চলুক। ওর যেহেতু এদিকে ঝোঁক আছে পরবর্তীতে ওকে কারিগরি শিক্ষায় দক্ষ করা যাবে।

আমার চার বছরের মেয়ে মাহিরাহ মুর্তজা খেলারছলে যখন বইপত্র নিয়ে বসে তখন আমি জানি না কেন এভাবে বলে ও। ও বলে, আম্মু আমি তো লাস্ট হতে চাই, লাস্ট হলে স্যাররা কী বলবে? আমি ওকে বলি, আম্মু তোমার লাস্ট বা ফার্স্ট হওয়ার দরকার নেই। তোমার যা ভালো লাগে তুমি তাই হবে। সে খুব খুশি। তাহলে তো খুবই ভালো। আমি আমার মতো থাকি, আমার মতো পড়াশোনা করি। ভালোই তো। অতি চাপমুক্ত, অতি প্রত্যাশামুক্ত একটি সুন্দর সুস্থ সময় ও পরিবেশ একটা সন্তানের সুষ্ঠু সামগ্রিক বিকাশের জন্য খুব জরুরি বলে মনে করি। কিন্তু একটা বিষয় আমি শুরু থেকেই ওর মধ্যে জাগিয়ে দিতে চাই তা হলো যে স্কুলে ফার্স্ট বা লাস্ট হওয়ার চেয়ে তোমার নিজের মনের ক্লাসে অবশ্যই একজন ফার্স্ট ক্লাস সুন্দর মানসিকতা সম্পন্ন মানুষ হওয়ার প্রত্যয় থাকতে হবে।

৮. নৈতিক শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি কম মনোযোগী হওয়া

প্রত্যেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নৈতিক শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ের গুরুত্বারোপ করা দরকার।

৯. কতিপয় শিক্ষকের অতি দাম্ভিকতা

আমরা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি তখন দেখতাম কিছু শিক্ষক আমাদের সাথে ভালোমতো কথা বলতেন, খোঁজ-খবর নিতেন অর্থাৎ মনিটরিং এবং মেন্টরিং দুটোই করতেন। এই দুটো বিষয়ের কম্বিনেশন থাকা খুব দরকার। আবার অন্যদিকে কিছু শিক্ষক ছিলেন তাদের অতি দাম্ভিকতা আমাদেরকে আরষ্ঠ করে রাখতো। আমরা যেন তাদের সামনে নিজেদেরকে ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারতাম না! কী জানি আবার কী মনে করেন! কী বলে ফেলেন ইত্যাদি শঙ্কা, আশঙ্কা মনের ভেতর কাজ করতো! যাই হোক দেখা যায় ছাত্র-ছাত্রীরা দিনের একটা বড় সময় বিদ্যালয়ে, কলেজে বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অতিবাহিত করে। এই সময়ের মধ্যে তার মেন্টরিং এবং মনিটরিং যদি পজিটিভলি এবং প্রোপারলি না হয় তাহলে এটা তাদের মনের ওপর একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। অনেক সময় দেখা যায় ছেলেমেয়েরা এতে করে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে, নিজেদেরকে ঠিকমতো প্রকাশ করতে চায় না, আবার অনেকে অপ্রত্যাশিত কিছু করেও ফেলে। তাই কোনো শিক্ষকের যেমন "সুপিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে" ভোগা ঠিক হবে না তেমনিভাবে কোনো শিক্ষার্থীরও "ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্সে" ভুগে নিজেদের শেষ করে দেয়া উচিত হবে না।

আমি মনে করি অরিত্রির মৃত্যুর দায় আমাদের সবার। তাই আমাদের স্ব স্ব জায়গা থেকে সংশোধন হতে হবে সাথে প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রগুলোতে সংশোধন আনতে হবে। সুন্দর, সুস্থ, সাবলীল, এবং আনন্দময় হোক সকল শিশুর শিক্ষা জীবন।

লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ফলিত পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি বিভাগ।

বিএ