ঢাকা, শনিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৭, ২ পৌষ ১৪২৪
BYজোনাথন ফ্রিডল্যান্ড    |    
প্রকাশ : ০৮ ডিসেম্বর, ২০১৭ ০৫:৪৫:৪৬

যুক্তরাষ্ট্রকে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক সংঘর্ষের কিনারে নিয়েও সন্তুষ্ট নন ডোনাল্ড ট্রাম্প, এখন তিনি আন্তর্জাতিক ধ্বংসোন্মাদনার জন্য তার কৌশল প্রয়োগ করছেন বিশ্বের সম্ভবত সবচেয়ে স্পর্শকাতর ভূরাজনৈতিক কেন্দ্রটিতে। জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস সেখানে সরিয়ে নেয়ার ঘোষণার মাধ্যমে ট্রাম্প উন্মুক্ত স্ফুলিঙ্গ নিয়ে শুকনো বাগানের মধ্য দিয়ে হাঁটতে যাচ্ছেন। জেরুজালেমের মর্যাদার বিষয়টি হল সবচেয়ে অনমনীয় ইস্যু, যার ওপর ভিত্তি করে বিশ্বের সবচেয়ে অনমনীয় সংঘর্ষ চলছে। এটি এমন একটি ইস্যু যা কয়েক দশকের বেশি সময় ধরে বহু শান্তি প্রক্রিয়ার প্রচেষ্টাকে নষ্ট করে দিয়েছে। ফিলিস্তিনি ও ইসরাইলিরা উভয়েই জোর দিয়ে বলছে, তাদের দেশের রাজধানী অবশ্যই হতে হবে জেরুজালেম। অতীতেও উভয়পক্ষ এমনটি বলেছে; এখনও বলছে, জেরুজালেমের এ মর্যাদা নিয়ে আলোচনা বা দরকষাকষির কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু তাদের কাছে এটাই শুধু গুরুত্বপূর্ণ নয় যে, জেরুজালেমের পুরনো নগরে রয়েছে ইহুদিদের সবচেয়ে পবিত্র স্থান এবং ইসলামের তৃতীয় পবিত্র মসজিদ। তবে এটি যে খ্রিস্টানদের কাছে প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ সেটা নিয়ে কিছু না বললেও নগরটিতে সামান্য নড়াচড়া শতকোটি ঝাঁকুনি হয়ে অনুভূত হয়। এটি এমন একটি স্থান যেখানে কূটনীতিকরা চরম যত্নের সঙ্গে হাঁটতে শিখেছেন। এসব কারণেই ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রায় ৭০ বছর পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রশাসনই, তা যতই ইসরাইলপন্থী হোক, জেরুজালেমকেন্দ্রিক নীতিতে পরিবর্তন আনেনি। কিন্তু অতীত এবং সত্যিকারের ইতিহাসের প্রতি অচেতন থেকে নাজুক জায়গাটিতে, যেখানে ইতিহাস জীবন ও মৃত্যুর খেলার বিষয়ে পরিণত হয়েছে, সব স্পর্শকাতরতাকে পায়ে মাড়িয়ে জোর কদমে এসে পড়েছেন ট্রাম্প। এর ঝুঁকি অবশ্যই স্পষ্ট- যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি দায়বদ্ধ এমনসহ সব আরব সরকার এখন ঝুঁকিপূর্ণ এ পদক্ষেপের জন্য তীক্ষè সতর্কবার্তা দিচ্ছে। তাদের প্রায় সবাই বিষয়টিকে ‘মারাত্মক’ শব্দ দিয়ে বিশেষায়িত করছে। চলুন আমরা স্পষ্টভাবে বিষয়টি বুঝি। বহুল আলোচিত ‘দুই রাষ্ট্র’ সমাধানের পক্ষের বেশিরভাগ পরামর্শক বিশ্বাস করেন, জেরুজালেম ইস্যুটি সমাধানের একমাত্র পথ হচ্ছে নগরটিকে দুই দেশেরই রাজধানী হিসেবে মেনে নেয়া- পূর্ব জেরুজালেম ফিলিস্তিনের এবং পশ্চিম জেরুজালেম হবে ইসরাইলের রাজধানী। কেবল তারপরই, আবারও বলছি, কেবল তারপরই দূতাবাসগুলো সরিয়ে নেয়া এবং স্বীকৃতি দেয়ার কাজ শুরু করার সঠিক মুহূর্তটি আসবে। সে দিনটি আসার আগ পর্যন্ত জেরুজালেমের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আগাম কোনো চুক্তির কার্যক্রম হবে একেবারেই বেপরোয়া ও উসকানিমূলক। এ উসকানিটি কেমন হতে পারে? ‘প্রথম ইনতিফাদার’ ঘটনাবলি স্মরণ করুন- যার ফল ছিল রক্তাক্ত দুই বছর বা তারও বেশি সময় ধরে ফিলিস্তিনি আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীদের হাতে ইসরাইলিদের এবং ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর হাতে ফিলিস্তিনিদের মৃত্যু। রক্তাক্ত ওই ইনতিফাদা শুরু হয়েছিল ২০০০ সালের শেষদিকে তৎকালীন ইসরাইলি বিরোধীদলীয় নেতা অ্যারিয়েল শ্যারনের মুসলিমদের কাছে হারাম আল-শরিফ এবং ইহুদিদের কাছে টেম্পল মাউন্ট হিসেবে পরিচিত তেজস্ক্রিয় সংঘাতের মূলকেন্দ্রবিন্দু জেরুজালেমে ৪৫ মিনিটের সফর শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। একই সঙ্গে ব্রিটেনে নিযুক্ত ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রদূতের বক্তব্যও- ট্রাম্পের পদক্ষেপ দেড়শ’ কোটি মুসলিমের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল- মনে রাখতে হবে। প্রশ্ন হল, কেন ট্রাম্প এমনটি করেছেন? হতে পারে তিনি দেখাতে চাচ্ছেন, নিজের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিকে সম্মান দিচ্ছেন; পাশাপাশি বর্তমানে ধনীদের ওপর থেকে কর কমানো এবং ছয়টি মুসলিম দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞার মতো বিতর্কিত বিষয় জেরুজালেম ইস্যু দিয়ে ঢাকতে চান ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, তিনি এটি করতে পারেন এবং সব পার্শ^প্রতিক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে এখন তা করছেন। এটি হচ্ছে নিজের ঘাঁটিতে তার রাজনীতির স্টাইল, ইসরাইলের ক্রিশ্চিয়ান ইভেনজেলিকাল হকিশ আন্দোলনের সঙ্গে যার মিল রয়েছে। গোটা বিশ্ব কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে এটা ভেবে যে, বাস্তবতা হচ্ছে এখনই দূতাবাস হস্তান্তর হচ্ছে না; এমনকি ২০২১ সালে ট্রাম্পের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে এটি নাও হতে পারে। হতে পারে এটিও জলবায়ুবিষয়ক প্যারিস চুক্তি থেকে ট্রাম্পের সরে আসার মতো ব্যাপার, যেটা বাস্তবতার চেয়েও বেশি প্রতীকী। কিন্তু এখানে প্রতীকী বিষয়টি ভুলে যেতে হবে, কারণ ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘাতের বেলায় প্রতীক একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। এ কারণেই বিশ্বনেতা এবং জ্যেষ্ঠ মার্কিন রাজনীতিকদের আন্তরিকভাবে বলার প্রয়োজন হবে, জেরুজালেমকে ইসরাইলের রাজধানী ঘোষণা এবং সেখানে দূতাবাস সরিয়ে নেয়া ভুল সিদ্ধান্ত। তারা এর সঙ্গে নেই। তাদের ইঙ্গিত দিতে হবে, ট্রাম্প চলে গেলে সুষ্ঠু একটি নীতি আসতে পারে। তারপরও সমস্যা হল, এ অঞ্চলে সহিংসতা আরও ছড়িয়ে পড়ার যে পথ দেখানো হল, তার সমাধানে এসব প্রত্যাশা হতে পারে দূরাশা। দ্য গার্ডিয়ান থেকে ভাষান্তর : সাইফুল ইসলাম জোনাথন ফ্রিডল্যান্ড : ব্রিটিশ সাংবাদিক  

x