ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২০, ৪ কার্তিক ১৪২৭

বড় দুই ধসের শিক্ষা নিয়ে বদলে যাচ্ছে পুঁজিবাজার

https://www.kalerkantho.com/online/business/2020/09/20/957265
BYরফিকুল ইসলাম   

একটু লাভের আশায় সাধারণ মানুষ তাদের জমানো ছোট ছোট সঞ্চয় বিনিয়োগ করেপুঁজিবাজারে। এই সঞ্চয় থেকে মূলধন নিয়ে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেন শিল্পোদ্যোক্তারা। ব্যাংকঋণের স্বল্পমেয়াদি নির্ভরতার বিপরীতে দীর্ঘ মেয়াদে মূলধনের জোগান দেয় পুঁজিবাজার। মূলধনেরবিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা পান কম্পানির শেয়ার ও লভ্যাংশের ভাগ।

তবে ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে দুই দফা বড় ধস নামলে দৃশ্যপট পাল্টে যায়। পুঁজিবাজার কারসাজি চক্র ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়ে মূলধন উধাও করে দিলে নিঃস্ব হয়ে পড়েতারা। ফলে দীর্ঘ সময় পার করলেও পুঁজিবাজারে নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরি হয়নি। এপরিস্থিতিতে বড় দুই ধস থেকে শিক্ষা নিয়ে নানামুখী সংস্কারের মাধ্যমে শক্ত ভিতের ওপর দাঁড় করানো হচ্ছে পুঁজিবাজার। আর মুখ ফিরিয়ে নেওয়া ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরাও আবার ফিরছেন পুঁজিবাজারে। কম্পানির শেয়ারে বিনিয়োগ করে লভ্যাংশের আশাও করছেন তাঁরা। বর্তমানে প্রতিদিনই পুঁজিবাজারে আসছে নতুন নতুন মূলধন। চলতি অর্থবছরের বাজেটে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়ায় অর্থের প্রবাহ আরো বেড়েছে।

গত মার্চ থেকে করোনা মহামারির ধাক্কায় তলানিতে নামে পুঁজিবাজার। ২৬ মার্চ থেকে ৩০ মে পর্যন্ত বন্ধ থাকার পর গত ৩১ মে খুলেছে পুঁজিবাজার। তবে মহামারির ধাক্কায় শেয়ারের দাম কমে যাওয়ায় লেনদেনে ফেরা যায়নি। অবশ্য আগস্ট থেকে পুঁজিবাজার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে।

জুন থেকে আগস্ট- এই তিন মাসের চিত্রে দেখা যায়, মূল্যসূচক, লেনদেন ও বাজার মূলধনে বেশ এগিয়েছে পুঁজিবাজার। এই সময়ে বাজার মূলধন বেড়েছে ৭৩ হাজার ৯৩২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা। আর সূচক বেড়েছে এক হাজার ১ পয়েন্ট। ১ জুন লেনদেন ছিল ১৯৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। ৩১ আগস্ট সেই লেনদেন বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ১৬৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়।

নিয়ন্ত্রক সংস্থা সূত্র জানায়, গত মে মাসে বিএসইসির দায়িত্ব নেয় বর্তমান কমিশন। ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার পর আরো তিনজন কমিশনার যুক্ত হন। কমিশনের দায়িত্ব নেওয়ার পর কম্পানির উদ্যোক্তা ও পরিচালকদের ২ শতাংশ ও সম্মিলিতভাবে ৩০ শতাংশ শেয়ার ধারণে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। দেওয়া হয় নির্দিষ্ট সময় বেঁধে শর্ত পরিপালনের নির্দেশনা। শর্ত পরিপালনে ব্যর্থ হলে কম্পানির পরিচালককে অপসারণ করে নতুন পরিচালক নিয়োগ দেবে কমিশন। বছরের পর বছর লোকসানে থাকা জেড ক্যাটাগরির কম্পানিগুলোসচল করতে উদ্যোগ নেওয়া হয়। বদলানো হয়েছে সম্ভাবনা থাকা কম্পানির শ্রেণি। শেয়ার কারসাজিতে জড়িত কম্পানি ও চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে কোটি কোটি টাকা জরিমানা করা হয়েছে। পুঁজিবাজারে সুশাসন ফেরাতে জোর দেওয়া হয়েছে। এর পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কম্পানিতে প্রশাসক বসানো হবে বলেও জানানোহয়েছে।

২০১৫ সালে পুঁজিবাজার সংস্কারে এগিয়ে আসে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। এর আগেও পুঁজিবাজার সংস্কারে বাজেট সহায়তা দেয় এডিবি। বর্তমানে থার্ড ক্যাপিটাল মার্কেট ডেভেলপমেন্ট কর্মসূচির (সিএমডিবি-৩) আওতায় ২৫ কোটি ডলার সহায়তা দিয়েছে তারা। এই অর্থ সহায়তায় নানামুখী সংস্কারের কারণে নতুন আইন তৈরির বেশির ভাগই শেষ।

সিএমডিবি-৩ প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, এই প্রকল্পের মাধ্যমে পুঁজিবাজারে আমূল পরিবর্তন এসেছে। ২০১৫ সালের মধ্যে প্রথম ধাপে মূলধন কাঠামো, মালিকানা, সুশাসন প্রক্রিয়া ও ঝুঁকি মোকাবেলায় ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট কম্পানি প্রস্তাবনা, পুঁজিবাজার বিষয়ক মামলা পরিচালনায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এটি বাস্তবায়নে দেওয়া হয় আট কোটি ডলার।

প্রথম ধাপের পর পরবর্তী ১৮ মাসের মধ্যে দ্বিতীয় ধাপের কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা পারা যায়নি। চলতি বছরের শুরুতে অবশিষ্ট ১৭ কোটি ডলার অর্থ ছাড় দেয় এডিবি। দ্বিতীয় ধাপে নিয়ন্ত্রক সংস্থা জনবল কাঠামো, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও কমপ্লায়েন্স অফিস পরিচালনা, আইসিটি প্রক্রিয়ার উন্নয়ন, মূলধন উত্তোলনের পাবলিক ইস্যু রুলস সংশোধন, মূলধন ঝুঁকি মোকাবেলায় রুলস, ক্লিয়ারিং অ্যান্ড সেটেলমেন্ট কম্পানি স্থাপন, স্বাধীন ফিন্যানশিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) স্থাপন, সুকুক, ডেরিভেটিবস ও কিছু রুলস-রেগুলেশনের সংশোধনী আনা হয়।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান ড. শিবলী রুবাইয়াত-উল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুঁজিবাজার দীর্ঘমেয়াদি মূলধন উত্তোলনের জায়গা, কিন্তু স্বল্পমেয়াদি উৎস হলেও ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ব্যবসা করেন উদ্যোক্তারা। আমরা চাইছি তাঁরা পুঁজিবাজার থেকে মূলধন নিক। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর পুঁজিবাজার শক্তিশালী করতে নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছি। আইন-কানুন সহজ করছি। নানাভাবে পুঁজিবাজার সংস্কার করছি।’

ড. শিবলী রুবাইয়াত আরো বলেন, ‘ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের ঠকিয়ে কেউ যেন আর টাকা নিয়ে যেতে না পারে সেসব পথ বন্ধ করা হচ্ছে। যারা কারসাজি কিংবা মূলধন হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) মিডওয়ে সিকিউরিটিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রকিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বর্তমান কমিশনের যুগোপযোগী সিদ্ধান্তে পুঁজিবাজার গতিশীল হচ্ছে। অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিমুখ হয়ে পড়া বিনিয়োগকারীরা আবার বাজারে ফিরছেন।’