ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭
BYনিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা
১৪ নভেম্বর ২০১৮, ২০:৫৪

বাংলাদেশের সংবিধানে ১৭ বার সংশোধনের মাধ্যমে আমরা এর মূল চরিত্র থেকে অনেকটাই সরে এসেছি। এতে জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে। শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সংশোধনী আনা হয়েছে।

আজ বুধবার বাংলাদেশ সংবিধান নিয়ে স্মারক বক্তৃতা ও সংবিধান দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজক বাঙলার পাঠশালা। সুপ্রিম কোর্টের শফিউর রহমান মিলনায়তনে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে স্মারক বক্তৃতা করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শাহদীন মালিক। শাহদীন মালিক তাঁর উপস্থাপনায় সংবিধানের সংশোধনীগুলোর প্রকৃতি, সংবিধানের মূল চরিত্রের ওপর সংশোধনীগুলোর প্রভাব, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংবিধান সংশোধনের ধরনও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের সংবিধান ১৭ বার সংশোধন করা হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংশোধন বিষয়ে সংসদে তিন দিনের বেশি আলোচনাও করা হয়নি। পঞ্চদশ সংশোধনীর সময় বাইরে দীর্ঘ আলোচনা হলেও সংসদে যে প্রতিবেদন উপস্থাপিত হয় সেখানে আলোচনার মূল বিষয়গুলো রাখাও হয়নি। শাহদীন মালিক বলেন, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সংশোধনীর মাধ্যমে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার খর্ব হয়েছে। রাষ্ট্রের জন্য জনগণ, না জনগণের জন্য রাষ্ট্র, সে প্রশ্নও উঠেছে সংবিধান সংশোধনের ধরন দেখে। রাষ্ট্রের মালিক যে জনগণ, তাদের চেয়ে ক্ষমতা বা রাষ্ট্রকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বেশি। সব সংশোধনীর ফলে বাহাত্তরের মূল সংবিধানে জনগণের যে মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিত করা ছিল, তা ক্রমাগত আরও সংকুচিত হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যদি আমরা আবারও বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে চাই, তাহলে আবারও “সংশোধিত সংবিধানের পুনঃ সংশোধন” করতে হবে।’ বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধি প্রসঙ্গে শাহদীন মালিক বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অনেকাংশে ক্ষুণ্ন হয়েছে। বিচারকেরা মনে করেন তাঁদের হাত-পা অনেকটাই বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ক্ষমতা এখন আইন মন্ত্রণালয়ের হাতে।

অনুষ্ঠানের সভাপতি জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান বলেন, কখনো ব্যক্তি স্বার্থে সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। কেউ নির্বাচনে যোগ্য ছিলেন না, তাঁকে যোগ্য করতে; কেউ সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করে নিজের পদে ফেরত যাবেন তার জন্য; কখনো সংবিধানের মূল কাঠামো পরিবর্তনের জন্য; আবার কখনো সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ—নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইন প্রণয়ন বিভাগের মধ্যে ক্ষমতার যে ভারসাম্য ও বিভাজন ছিল, তার ওপর প্রভাব পড়েছে। কেউ অস্বীকার করতে পারেননি যে মূল সংবিধান থেকে আমরা সরে এসেছি।’

বিশিষ্ট এ শিক্ষাবিদ মনে করেন, এখনো উপায় আছে সংবিধান সংশোধন করে জনগণের কাছে ফিরে যাওয়ার। এ জন্য এখন রাষ্ট্রের কোনো বিভাগ অর্থাৎ আইন, শাসন ও বিচার বিভাগের কোনো একটি বিভাগ যদি জনগণের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে, তাহলে সংবিধান সংশোধন করে জনগণের প্রাধান্য নিশ্চিত করতে হবে। কারণ সংবিধানেই বলা হয়েছে রাষ্ট্রের মালিক জনগণ। এ ব্যাপারে জনগণকে সচেতন করতে হবে, যাতে বাহাত্তরের মূল সংবিধানে ফিরে যেতে হলে জনগণের মাধ্যমে চাপ সৃষ্টি করা যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, সংশোধনী সংবিধান কিছু কিছু ক্ষেত্রে ‘পরস্পরবিরোধী হাস্যকর জগাখিচুড়িতে’ পরিণত হয়েছে। বর্তমান সংবিধানে রাষ্ট্র ধর্ম ইসলামের বিধানও আছে আবার ধর্মনিরপেক্ষতাও আছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে অদূর ভবিষ্যতে মুক্তিযুদ্ধের আদি সংবিধানের স্বপ্ন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে—এমন কোনো লক্ষণ নেই বলেও মন্তব্য তাঁর। বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা মনে করেন, এখন সংবিধানে পরিবর্তন বিষয়ে জনগণের তেমন আগ্রহ নেই। কারণ তারা এ বিষয়ে সচেতন নয়। ফলে ক্ষমতাসীনেরা বিভিন্ন সময় তাদের প্রয়োজন মতো সংবিধান সংশোধন করছে।