ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২০ জুন ২০১৯, ৬ আষাঢ় ১৪২৭
২৫ মে ২০১৯, ১১:০৭

সরকারের পাঁচ সংস্থার অধীন কারখানাগুলোর লোকসান বেড়েই চলেছে। সরকারি তথ্যমতে, ২০০৮-৯ অর্থবছরে এসব কারখানার লোকসান ছিল ৩২৫ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে লোকসান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। অর্থাৎ ১০ বছরে লোকসান বেড়েছে ছয় গুণ। আর জনগণের করের অর্থ থেকেই এর জোগান দিতে হচ্ছে।

এই পাঁচ সংস্থার মধ্যে বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি), বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশন (বিএসএফআইসি) ও বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশন (বিএসইসি) পরিচালিত হয় শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে। বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) ও বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) রয়েছে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীনে। ভিন্ন ভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়ের অধীন থাকলেও তাদের কর্মসংস্কৃতি প্রায় অভিন্ন। লোকসানের অপসংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার কারও চেষ্টা নেই।

স্বাধীনতার পর সরকারের ঘোষিত অর্থনৈতিক পরিকল্পনা অনুযায়ী এবং কিছুটা বাধ্য হয়ে উল্লিখিত শিল্পকারখানা রাষ্ট্রায়ত্ত করা হয়েছিল। কেননা, এসব শিল্পকারখানার অধিকাংশেরই মালিক ছিলেন পাকিস্তানিরা। সরকারের ভুল নীতি, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, স্বেচ্ছাচারিতার কারণে এসব কারখানা কখনোই লাভজনক হয়নি। তাই ৪৮ বছরের নির্মম বাস্তবতা হলো, লোকসানের দায়ে আদমজীসহ বহু কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, বহু কারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। অনেকে ভুয়া উদ্যোক্তা সেজে কারখানা কেনার নামে ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে লোপাট করে দিয়েছেন। তবে এর মধ্যেও বেসরকারি অনেক উদ্যোক্তা শিল্পকারখানাকে লাভজনক করতে পেরেছেন, যার মূল শক্তি হলো সততা ও দক্ষতা।

স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, বেসরকারি খাতের এসব শিল্পকারখানা লাভ করতে পারলে সরকারি খাতের কারখানাগুলো কেন ক্রমাগত লোকসান দিয়ে যাবে? কিছুদিন আগে রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানার শ্রমিকেরা আন্দোলনে নেমেছিলেন বকেয়া বেতন-ভাতা ও নতুন মজুরিকাঠামোর দাবিতে। সরকার সাড়ে তিন শ কোটি টাকার জোগান দিয়ে আপাতত ধর্মঘট স্থগিত করাতে পেরেছে। কিন্তু এভাবে তো সরকারি খাতের কারখানা চিরকাল চলতে পারে না।

লোকসানের কারণ হিসেবে বিএসএফআইসি পুরোনো মিল, চলতি মূলধনের অভাব, আখের বিপরীতে চিনির দাম না বাড়ানোর কথা উল্লেখ করেছে। বস্ত্র ও পাট খাতের সমস্যা আরও প্রকট। বহু পুরোনো মেশিন এ যুগে প্রায় অচল হয়ে পড়েছে,এগুলোর উৎপাদন ক্ষমতা খুবই কম। তবু সেগুলো জোড়াতালি দিয়ে চালানো হচ্ছে। তদুপরি শ্রমিক ইউনিয়নের নামে জবরদস্তি এবং প্রশাসনের অনিয়ম–দুর্নীতি তো আছেই। বিজেএমসির চেয়ারম্যান লোকসানের দায় শুধু শ্রমিকদের ওপর চাপিয়ে পার পেতে চাইছেন, কিন্তু নিজেদের ব্যর্থতার কথা স্বীকার করছেন না।

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা নিয়ে সরকার নির্বিকার থাকলেও বিশেষজ্ঞরা গবেষণা করে সংকট উত্তরণে নানা সুপারিশ করেছেন। সরকারের উচিত হবে সেসব সুপারিশ আমলে নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা। প্রয়োজনে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটি গঠন করে তাদের কাছ থেকে সহযোগিতা নেওয়া। তবে কমিটি গঠনের নামে সময়ক্ষেপণ করা যাবে না। লোকসান দিয়ে কোনো রাষ্ট্রায়ত্ত কারখানা চালানো হলে তার দায় সংশ্লিষ্টদেরই নিতে হবে। লোকসানের জন্য শ্রমিক দায়ী হলে যাঁরা শ্রমিকদের পরিচালনা করেন, তঁারা কীভাবে দায় এড়াবেন? আবার পরিচালনা সংস্থা দায়ী হলে সরকার কীভাবে দায় এড়াবে?

রাষ্ট্রায়ত্ত শিল্পকারখানা বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও দেখতে হবে তাদের সেটি চালানোর অভিজ্ঞতা ও দক্ষতা আছে কি না। যাঁদের এই শিল্পের অভিজ্ঞতা নেই, কারখানা কেনার নামে তঁারা ব্যাংকঋণ কিংবা কারখানার সম্পদ হাতিয়ে না নেন, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে। অতীতে ভুল উদ্যোক্তাদের কাছে কারখানা বিক্রি করে সরকার দুইভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি কাম্য নয়।