ঢাকা, রবিবার, ৩১ মে ২০২০, ১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ৭ বছর, বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে

https://www.ppbd.news/https:/ppbd.news/national/155417
BYবিশেষ প্রতিনিধি
প্রকাশ:  ২৪ এপ্রিল ২০২০, ০৫:২৮ | আপডেট : ২৪ এপ্রিল ২০২০, ০৬:০৪

কেবল বাংলাদেশই নয়, বিশ্বের ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনা রানা প্লাজা ট্রাজেডির সাত বছর পূর্ণ হলো আজ। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিলের এই দিনে সাভারের রানা প্লাজা ধসে মারা গিয়েছিলেন এক হাজার ১৩৬ জন শ্রমিক। আহত হন আরও প্রায় তিন হাজার শ্রমিক।

সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডের রানা প্লাজা ভবনটি ছিল তালার। ভবনটির তৃতীয়তলা থেকে নবম তলা পর্যন্ত ছিল পাঁচটি পোশাক কারখানা। এতে প্রায় পাঁচ হাজার পোশাক শ্রমিক কাজ করতেন। সকালে হঠাৎ করেই বিকট শব্দ। কিছু বুঝে ওঠার আগেই কয়েক হাজার শ্রমিক নিয়ে মুহূর্তের মধ্যে ধসে পড়ে ভবনটি। ধসে পড়া ভবন থেকে ১ হাজার ১১৭ টি মৃত উদ্ধার করা হয়। পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরো ১৯ জন মারা যায়। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে ২৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। যাদের মধ্যে পঙ্গুত্ব বরণ করেন ১ হাজার ১৬৯ জন শ্রমিক।

সম্পর্কিত খবর

সাত বছর আগে সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় মোট তিনটি মামলা হয়। এর মধ্যে অবহেলাজনিত মৃত্যু চিহ্নিত হত্যা মামলাটি করে পুলিশ। ইমারত নির্মাণ আইন লঙ্ঘন করে ভবন নির্মাণের অভিযোগে অপর মামলাটি করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক)। আর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে আরেকটি মামলা করে।থমকে আছে হত্যা মামলা

দেশের ইতিহাসের এই নৃশংস মৃত্যুর ঘটনায় করা হত্যা মামলার বিচার মোটেও এগোয়নি। মামলার দুজন অভিযোগপত্রভুক্ত আসামির পক্ষে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ থাকায় বর্তমানে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ বন্ধ রয়েছে। কবে নাগাদ মামলাটির সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম শুরু হবে, এ ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট দিনক্ষণ জানাতে পারেননি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রধান আইন কর্মকর্তা সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) খোন্দকার আবদুল মান্নান। তিনি জানান, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের ব্যাপারে তাঁদের (পিপি) পক্ষে কিছু করার থাকে না। বরং অ্যাটর্নি জেনারেল অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত আইন কর্মকর্তারা স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের ব্যাপারে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আইনি পদক্ষেপ নেবেন।

রানা প্লাজা ধসের জন্য ছয়জন সরকারি কর্মকর্তাকে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি করার অনুমতি না পাওয়ার কারণে তিন বছর ঝুলে ছিল এই মামলা। ওই সময় জনপ্রশাসন ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের যুক্তি ছিল, যাঁরা বড় অপরাধ করেননি, তাঁদের অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি করার অনুমতি দিতে পারবে না তারা। শেষ পর্যন্ত সরকারের অনুমোদন না পাওয়া গেলেও তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

২০১৬ সালের ১৮ জুলাই হত্যার অভিযোগে রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাসহ ৪১ জনের বিরুদ্ধে ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালত অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেন। বিচারিক আদালতের অভিযোগ গঠনের আদেশের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আট আসামি হাইকোর্টে আবেদন করেন।শুনানি নিয়ে এই আটজনের পক্ষে হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ আসে। ইতিমধ্যে ছয় আসামির স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। কেবল সাভার পৌরসভার তৎকালীন মেয়র রেফায়েত উল্লাহ এবং তৎকালীন কাউন্সিলর মোহাম্মদ আলী খানের পক্ষে স্থগিতাদেশ বহাল আছে।

আদালত সূত্র জানিয়েছে, রানা প্লাজা ধসের হত্যা মামলায় ৪১ আসামির মধ্যে বর্তমানে কারাগারে আছেন একজন। তিনি হলেন রানা প্লাজা ভবনের মালিক সোহেল রানা। জামিনে আছেন ৩২ আসামি। পলাতক আছেন ছয়জন। মারা গেছেন দুই আসামি।

অভিযোগপত্রে যা বলা হয়েছে

রানা প্লাজা ধসের হত্যা মামলাটি প্রথমে তদন্ত করে সাভার থানা-পুলিশ। এরপর তদন্ত করে ঢাকা জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। সর্বশেষ পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) জ্যেষ্ঠ সহকারী পুলিশ সুপার বিজয় কৃষ্ণ কর আদালতে অভিযোগপত্র দেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০১৩ সালের ২৩ এপ্রিল সকাল সাড়ে নয়টায় সাভারের রানা প্লাজা ভবনের তৃতীয় তলায় পিলার ও দেয়ালে ফাটল দেখা দেয়। খবর পেয়ে বিজিএমইএর কর্মকর্তারা রানা প্লাজা ভবনে আসেন। গার্মেন্টস মালিকদের পরামর্শ দেন, বুয়েটের ভবন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করা পর্যন্ত সব কার্যক্রম যেন বন্ধ রাখা হয়। কিন্তু পাঁচজন গার্মেন্টস মালিক এবং তাঁদের লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে পরের দিন (২৪ এপ্রিল) শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেন। এর সঙ্গে যোগ দেন রানা প্লাজা ভবনের মালিক খালেক ও সোহেল রানা। সোহেল রানা সেদিন বলেছিলেন, ‘আগামী এক শ বছরেও রানা প্লাজা ভেঙে পড়বে না।’

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, রানা প্লাজা ভবন তৈরির প্রতিটি ক্ষেত্রে অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছিলেন ভবনটির মালিক খালেক এবং তাঁর ছেলে সোহেল রানা। যা রানা প্লাজা ভবনকে একটি মৃত্যুকূপে পরিণত করে।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, বাণিজ্যিক এই ভবনে পাঁচটি গার্মেন্টস কারখানা ছিল। এসব কারখানায় বসানো হয় বৈদ্যুতিক ভারী জেনারেটর, ভারী সুইং মেশিন। রানা প্লাজা ধসের আগের দিন ভবনের তৃতীয় তলায় ফাটল দেখা দেয়। কিন্তু মালিকপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা না করে পরদিন পাঁচটি গার্মেন্টস কারখানা চালু করে। ঘটনার দিন সকাল ৯টায় রানা প্লাজায় হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন একসঙ্গে গার্মেন্টস কারখানাগুলোয় তিনটি জেনারেটর চালু করে। ঠিক তখনই রানা প্লাজা ভবন বিকট শব্দ করে ধসে পড়ে।

ইমারত নির্মাণ আইনের মামলাও স্থগিত

ইমারত নির্মাণ আইনে মামলায় রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানা ও তার বাবাসহ ১৮ জনের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালের ২৬ এপ্রিল অভিযোগপত্র দেয় পুলিশের অপরাধ ও তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ওই অভিযোগপত্র আমলে নিয়ে ঢাকার মুখ্য বিচারিক হাকিম (সিজিএম) আদালত পরের বছর ১৪ জুন অভিযোগ গঠন করেন। ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন আসামি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন।

রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনাকারী সরকারি কৌঁসুলি আনোয়ারুল কবীর জানান, রিভিশন আবেদন করায় ইমারত আইনের মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম বন্ধ আছে। সিজিএম আদালতে নথি আসার পর সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম শুরু হবে। তবে রানা প্লাজা ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতির মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ কার্যক্রম চলছে ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে। ২০১৭ সালের ২১ মে সোহেল রানাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।

বিশেষ জজ আদালরে ওই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে কয়েকজন আসামি ঢাকার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। রিভিশনের কারণে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ গত দুই বছর ধরে স্থগিত রয়েছে জানান পিপি খন্দকার আবদুল মান্নান। তবে কবে এই রিভিশন আবেদনের রায় আসবে, এ বিষয়ে তিনি কোনো ধারণা দিতে পারেননি।

ভবন নির্মাণ সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলা চলমান

রানা প্লাজা ট্রাজেডির ঘটনায় দায়ের করা তিনটি মামলার মধ্যে একমাত্র ভবন নির্মাণসংক্রান্ত দুর্নীতির মামলার বিচার চলমান। মামলাটি ঢাকার বিভাগীয় বিশেষ জজ আদালতে সাক্ষ্য গ্রহণ চলমান।

ছয়তলা ভিত্তির এ ভবনকেনকশাবহির্ভূতভাবে নয়তলা ভবন নির্মাণ ও সাভার পৌরসভা থেকে অবৈধভাবে পোশাক কারখানা স্থাপন করার অনুমোদন নেওয়ার অভিযোগে দুদকের উপপরিচালক এস এম মফিদুল ইসলাম বাদী হয়ে সাভার থানায় এই মামলা করেন। ২০১৪ সালের ১৪ জুলাই মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দুদকের মফিদুল ইসলাম আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। রানা প্লাজা নির্মাণে দুর্নীতির অভিযোগে করা মামলায় ভবন মালিক সোহেল রানাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে দুজনের সাক্ষ্য গ্রহণ করেছেন আদালত। এ মামলটির সাক্ষগ্রহণ প্রক্রিয়া চলামান।

সপ্তম বর্ষপূর্তির কর্মসূচি

রানা প্লাজা ট্রাজেডির সপ্তম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে আজ সকাল ৮টায় সাভারে রানা প্লাজার সামনে অবস্থিত স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পমাল্য অর্পণ এবং সংক্ষিপ্তভাবে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ প্রদর্শন করবে গার্মেন্ট টিইউসি। তবে করোনা ভাইরাসের এই বিপর্যয়ের মধ্যে শ্রমিকরা যাতে সেখানে জড়ো হতে না পারে সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে।

সাভার পৌর এলাকায় আজ শুক্রবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাঁচাবাজারসহ সব ধরনের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান (ওষুধের দোকান ছাড়া) বন্ধ রাখতে মাইকিং করা হয়েছে পুলিশের পক্ষ থেকে। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে রানা প্লাজা ও আশপাশের রাস্তায় লোকজন যাতে চলাচল না করে সে ব্যাপারেও বলা হয়েছে। বাড়তি সতর্কতার অংশ হিসেবে রানা প্লাজার সামনে গতকাল বৃহস্পতিবার বিকাল থেকে অবস্থান নিয়েছে বিপুল সংখ্যক পুলিশ। পুলিশ কর্মকর্তারা এ নিয়ে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। তবে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্বজনরা অস্থায়ী বেদিতে মোমবাতি প্রজ¦ালন করে নিহতদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

পূর্বপশ্চিম এনই