ঢাকা, সোমবার, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫

‘ফাস্টফুড’ কালচার ফ্যাটি লিভারের অন্যতম কারণ

https://www.jugantor.com/todays-paper/city/59104/ফাস্টফুড-কালচার-ফ্যাটি-লিভারের-অন্যতম-কারণ
BY  রাশেদ রাব্বি ১২ জুন ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
আজ বিশ্ব ফ্যাটি লিভার দিবস। এটি এখন বিশ্বজনীন এক রোগ। তবে পশ্চিমা বিশ্বে এর প্রাদুর্ভাব খুবই বেশি। আমেরিকায় পূর্ণবয়স্কদের মধ্যে শতকরা প্রায় ৩০ ভাগ এবং শিশুদের মধ্যে ১০ ভাগ ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত। জাপান ও ইতালিতে মোট জনসংখ্যার ৩০ ভাগ থেকে ৫৮ ভাগের ফ্যাটি লিভার রয়েছে। আমাদের দেশেও এ রোগে আক্রান্তদের হার বাড়ছে।

অতিরিক্ত ফ্যাট বা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার গ্রহণের ফলে লিভারে চর্বি জমতে পারে। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জনপ্রিয় ‘ফাস্টফুড’ কালচার এদেশে ফ্যাটি লিভারের প্রাদুর্ভাবের বড় কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

ফোরাম ফর দ্য স্টাডি অব দ্য লিভার পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের পর ফ্যাটি লিভারই এদেশে ক্রনিক হেপাটাইটিসের প্রধান কারণ। একইভাবে আমাদের আরেক গবেষণায় দেখা যায় যে, এদেশে প্রায় ৪ শতাংশ লিভার সিরোসিস রোগী ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাশ্চাত্যে ফ্যাটি লিভারের মূল কারণ অ্যালকোহল। তবে আমাদের মতো দেশগুলোয় মেদ-ভুড়ি, ডায়াবেটিস, ডিজলিপিডেমিয়া বা রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, হাইপারটেনশন বা অতিরিক্ত রক্তচাপ আর হাইপোথাইরয়েডিজমই ফ্যাটি লিভারের মূল কারণ। বিশেষ করে ডায়াবেটিস রোগীদের এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি খুবই বেশি।

আমেরিকায় পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ৩৩ ভাগ ডায়াবেটিস রোগীর ফ্যাটি লিভার রয়েছে। অন্যদিকে ৪৯ ভাগ ভারতীয় যাদের ডায়াবেটিস রয়েছে, তারা পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারেও আক্রান্ত। হেপাটাইটিস ভাইরাসগুলোর মধ্যে হেপাটাইটিস সি ভাইরাস আনেক সময়ই ফ্যাটি লিভার তৈরি করে থাকে।

কর্টিকোস্টেরয়েড, টেমোক্সিফেন ইত্যাদি ওষুধ দীর্ঘদিন সেবনেও ফ্যাটি লিভার হতে পারে। ফ্যাটি লিভারের আরেকটি বড় কারণ খাদ্যাভাস ও লাইফ স্টাইল। সিডেন্টারি বা আয়েশি জীবনযাপন আর অতিরিক্ত ফ্যাট বা কার্বোহাইড্রেটযুক্ত খাবার খেলে লিভারে চর্বি জমতেই পারে। আমাদের দেশে ইদানীংকার খুবই জনপ্রিয় ‘ফাস্টফুড’ কালচার এদেশে ফ্যাটি লিভারের বাড়তি প্রাদুর্ভাবের সম্ভবত একটি বড় কারণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভারে আক্রান্ত অনেকেরই লিভারে ক্রনিক হেপাটাইটিস দেখা দিতে পারে। যাকে স্টিয়াটো হেপাটাইটিস বলা হয়। ফ্যাটি লিভার লিভার সিরোসিস ও লিভার ক্যান্সারের অন্যতম প্রধান কারণ। ফ্যাটি লিভারের কারণে গত কয়েক দশকে প্রায় ২ মিলিয়ন আমেরিকান লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত হয়। প্রতিবেশী ভারতে লিভার সিরোসিসে আক্রান্ত রোগীদের শতকার ১৬ ভাগের ফ্যাটি লিভার রয়েছে।

আন্তর্জাতিক জার্নালে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী যেসব রোগীর স্টিয়াটো হেপাটাইটিস আছে, তাদের প্রায় ৩০ শতাংশ পরবর্তী সময়ে লিভারে সিরোসিস দেখা দিতে পারে। আর এদের কেউ কেউ লিভার ক্যান্সারেও আক্রান্ত হতে পারেন। ফ্যাটি লিভার থেকে একবার লিভার সিরোসিস হলে, ১৫ শতাংশ রোগী সাত বছরের মধ্যে আর ২৫ শতাংশ দশ বছরের মধ্যে মৃত্যুবরণের ঝুঁকিতে থাকে।

অন্যান্য বেশির ভাগ ক্রনিক লিভার ডিজিজ রোগীদের মতো ফ্যাটি লিভার রোগীদেরও প্রায়ই কোনো লক্ষণ থাকে না বলে জানান সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা। তবে রোগীদের কেউ কেউ পেটের ডান পাশে উপরের দিকে ব্যথা, ভার ভার ভাব বা অস্বস্তি, দুর্বলতা কিংবা খুব অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ার কথা বলে থাকেন।

শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় এসব রোগীর প্রায় ৫০ ভাগের লিভার বড় পাওয়া যায়। রক্ত পরীক্ষায় সিরাম ট্রান্স-এমাইনেজ বেশি থাকতে পারে। ফ্যাটি লিভার নির্ণয়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত পরীক্ষাটি হচ্ছে আল্ট্রাসনোগ্রাম। যদিও সিটি স্ক্যান বা এমআরআই এক্ষেত্রে বেশি নির্ভরযোগ্য।

পাশাপাশি ফ্যাটি লিভারের অধিকাংশ রোগীরই রক্তে সুগার, কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড বেশি থাকে। ফ্যাটি লিভারের রোগীদের রোগ নির্ণয়ের জন্য ইদানীং খুবই উপকারী পরীক্ষা হচ্ছে ফাইব্রোস্ক্যান। পরীক্ষাটি অনেকটা আল্ট্রাসনোগ্রামের মতো। এই মেশিনের সাহায্যে খুব সহজেই লিভারে ফাইব্রোসিস বা স্থায়ী ক্ষতির মাত্রা জানা যায়।

এ রোগ চিকিৎসা সম্পর্কে জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের লিভার বিভাগের অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল যুগান্তরকে বলেন, ফ্যাটি লিভার চিকিৎসার মূল লক্ষ্যই হচ্ছে লিভারে সিরোসিস ও ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রতিরোধ করা।

অতিরিক্ত মেদ কমানো ফ্যাটি লিভার চিকিৎসার একটি অন্যতম দিক। তবে খুব দ্রুত, অপরিকল্পিতভাবে ওজন কমালে তাতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। কারণ এর ফলে লিভার সিরোসিসের ঝুঁকি বেড়ে যায়।

ওজন কমানোর জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পরিকল্পিত ডায়েট কন্ট্রোল, এক্সারসাইজ, ওষুধ সেবন কিংবা প্রয়োজনে অপারেশন করা যেতে পারে। তিনি বলেন, এখনও এজন্য শতভাগ কার্যকর কোনো ওষুধ আবিষ্কৃৃত হয়নি। তবে বাজারে বেশ কিছু ওষুধ আছে, যা ফ্যাটি লিভারের চিকিৎসায় উপকারী বলে প্রমাণিত।