ঢাকা, মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ৭ কার্তিক ১৪২৭

তদন্তে জাহালমের বাড়ি না গিয়েই প্রতিবেদন দিয়েছিলেন দুদক কর্মকর্তারা

https://www.ppbd.news/https:/ppbd.news/national/114686
BYনিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ:  ১১ জুলাই ২০১৯, ২৩:৪১

ফাইল ছবি দুদকের ভুলে প্রায় তিন বছর কারাভোগের পর উচ্চ আদালতের নির্দেশে মুক্ত টাঙ্গাইলের জাহালম ওরফে জানে আলমের দায় স্বীকার ক‌রে আদাল‌তে প্র‌তি‌বেদন দা‌খিল ক‌রে‌ছে দুদকের তদন্ত কমিটি। বিনা দোষে তাকে জেল খাটার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মামলার পাবলিক প্রসিকিউটরসহ (পিপি) সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয়হীনতা ছিল বলেও উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে।

এতে বলা হয়েছে, দুদকের ১২ তদন্ত কর্মকর্তার কেউই জাহালমের বাড়ি পরিদর্শন করেননি। যাচাই করেননি কোনও তথ্য। একজন অন্যজনের ওপর নির্ভর করেছেন। এক তদন্ত কর্মকর্তার তৈরি প্রতিবেদন আরেকজন ‘কপি-পেস্ট’ করেছেন। দুদক কর্মকর্তাদের তদন্তে গাফিলতি, ব্যাংক কর্মকর্তাদের দায়িত্বহীনতা ও অর্থ-আত্মসাতের ঘটনায় একটি চক্রের জড়িত থাকারও বিশদ বিবরণ উঠে এসেছে।

বৃহস্পতিবার (১১ জুলাই) বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চে ওই প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি দাখিল করেছেন দুদকের আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান।

তবে প্রতিবেদনের বিষয়ে কোনও আদশ না দিয়ে মামলার পরবর্তী শুনানির জন্য ১৬ জুলাই দিন নির্ধারণ করেছেন আদালত। আদালতে জাহালমের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী অমিত দাসগুপ্ত।

এর আগে আদালত জাহালমের ঘটনা উদ্ঘাটন ও সংশ্লিষ্টদের দায় নির্ধারণ করে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দিয়েছিলেন। যার ধারাবাহিকতায় দুদক পরিচালক (লিগ্যাল) আবুল হাসনাত মো. আব্দুল ওয়াদুদের নেতৃত্বাধীন কমিটি ওই প্রতিবেদন তৈরি করে।

মামলার অনুসন্ধান ও তদন্তে ত্রুটি-বিচ্যুতি উদঘাটন:

প্রতিবেদনে বলা হয়, সোনালী ব্যাংকের ক্যান্টনমেন্ট শাখায় হিসাব খোলার সঙ্গে সঙ্গে প্রতারকচক্র আরও ১৮টি ব্যাংকের ৩৩টি শাখায় হিসাব খোলে। ওইসব হিসাবের মাধ্যমে ভুয়া ভাউচার ব্যবহার করে মোট ১৮ কোটি ৪৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা আত্মসাৎ করে। অভিযোগ, সংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্রের পরিমাণ বিপুল ও জড়িত থাকা ব্যক্তির সংখ্যাও অনেক। এখানে কোনও অনুসন্ধান দল গঠন না করে একজন মাত্র অনুসন্ধান কর্মকর্তা (ইও) আব্দুল্লাহ আল জাহিদকে ২০১০ সালের ২৬ ডিসেম্বর নিয়োগ করা হয়। কিন্তু তিনি বিষয়টি নিশ্চিতভাবে কমিশনের (দুদক) নজরে আনেননি।

আদালতে দাখিল করা প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, একই ঘটনায় একাধিক মামলা করা আইনসম্মত নয়। এরপরও ১টি মামলার পরিবর্তে ৩৩টি মামলা দায়ের করাসহ ঘটনাস্থলগুলো পরিবর্তন করে ফেলায় গুরুত্বপূর্ণ আইনগত প্রশ্ন জড়িত ছিল। অভিযোগটির অনুসন্ধান কর্মকর্তা, তদারক কর্মকর্তা বা সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক কেউই দুদকের লিগ্যাল অনুবিভাগের আইনি অভিমত নেননি। তাই এ ভুলের দায় ইও, তদারককারী কিংবা সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক এড়াতে পারেন না।

এজাহারে জাহালম নামে কাউকে আসামি করা হয়নি। তবে টাঙ্গাইলের নাগরপুরের গুনিপাড়া গ্রামের মো. আবু সালেককে আসামিভুক্ত করা হয়। তবে, ইও কোনও আসামির ঠিকানা যাচাই না করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও সোনালী ব্যাংকের গঠিত দুটি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেছেন। ফলে ভুয়া নাম-ঠিকানা সংবলিত ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে। তদন্ত কর্মকর্তা ২০০৭ সালের দুদক বিধিমালা অনুসারে সরেজমিন অনুসন্ধান করেননি। সরেজমিন অনুসন্ধান করলে আবু সালেকের ঠিকানার বিষয়ে তার অনুসন্ধানেই বের হয়ে আসতো। অনুসন্ধানকালে তদারককারী হিসেবে মুহাম্মদ আশরাফ আলীর কোনও অবদান দেখা যায় না। এছাড়া সংশ্লিষ্ট ডেস্ক অফিসার কিংবা মহাপরিচালকও তাদের কাছে এ বিষয়ে কিছু বলেননি। তারা যত্নশীল হলেই অনুসন্ধান পর্যায়ে এসব মামলার ত্রুটি-বিচ্যুতি উদঘাটন করা সম্ভব হতো।

দুদকের তদন্ত প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, অর্থপাচার সংক্রান্ত মামলা তদন্তের ক্ষেত্রে অর্থের গন্তব্যের বিষয়ে তদন্ত করলে স্বাভাবিকভাবেই অপরাধীর খোঁজ পাওয়া যেতো। এক্ষেত্রে তদন্ত কর্মকর্তাদের একটি অযোগ্যতা ছিল। একইসঙ্গে এই মামলায় অনেক ব্যাংক কর্মকর্তা জড়িত থাকলেও তাদের অভিযুক্ত করা হয়নি। কিন্তু তাদের চার্জশিটভুক্ত করা উচিত ছিল।

এই মামলার আরেক আসামি আমিনুল হক ওরফে হক সাহেবের বিরুদ্ধে আত্মসাৎ করা অর্থের একটি বড় অংশের ভাগ পাওয়ার তথ্য প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে। অথচ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের উদ্যোগ না নেওয়ার বিষয়টি বোধগম্য নয়। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলেই তার কাছ থেকে এসব মামলার সব তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।

এই মামলায় প্রায় ১২ জন তদন্তকারী তদন্ত প্রতিবেদন দুদকে দাখিল করেন কিন্তু কেউই আসামি জাহালমের বাড়ি পরিদর্শন করেননি। পরিদর্শন করলেই জাহালমের বাড়ির দৈন্যদশা দেখে তিনি ১৮ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিতো।

উল্লেখ্য, অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় ২০১০ সালে প্রথমে মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করা হলে পুলিশ তদন্ত করে। পরবর্তী সময়ে মামলাটি তদন্তের জন্য দুদকে পাঠানো হয়। একই ঘটনা অনুসন্ধান করে দুদক ৩৩টি মামলা দায়ের করে, যার কোনও প্রয়োজন ছিল না বলে উল্লেখ করা হয়েছে বর্তমান প্রতিবেদনে। এতে আরও বলা হয়েছে, মতিঝিলের মামলাই চার্জশিট দেওয়া সম্ভব ছিল। ৩৩টি পৃথক মামলা করায় তদন্ত করতে বিভিন্ন জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে এবং তদন্ত কর্মকর্তাদের মাঝে সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। দুদক থেকে ওই ৩৩টি মামলা দায়েরের পর ২০১১ সালের আগস্ট মাসে দুদকে নিয়োগপ্রাপ্ত ১১ শিক্ষানবিস কর্মকর্তাকে তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়। কিন্তু মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ করার পরপরই তাদের এ ধরনের অত্যন্ত জটিল কাজে যুক্ত করা হয়।

যেভাবে জাহালম হলেন আবু সালেক:

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জাহালমকে আবু সালেক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে দুদক কর্মকর্তাদের কারণেই। আর তাদের ভুল পথে চালিত করেছে ব্র্যাক ব্যাংকসহ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও অ্যাকাউন্টের ভুয়া ব্যক্তিকে পরিচয়দানকারীরা।

তবে, মামলায় জড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ব্যাংক কর্মকর্তারা আবু সালেককে খুঁজে বের করতে যেনতেনভাবে একজন আবু সালেককে (মূলত জাহালম) দুদকের সামনে হাজির করে।

এই ৩৩টি মামলার তদন্ত কর্মকর্তারা মামলার তদন্ত সঠিকভাবে করেননি এবং প্রত্যেকেই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। প্রত্যেকেই আশায় ছিলেন, তদন্তে কোনও অগ্রগতি হলে তারা সেটি কপি করবেন। শেষ পর্যন্ত তারা তা-ই করেছেন। তবে, তদন্ত কর্মকর্তাদের মধ্যে সেলিনা আখতার মনি প্রকৃত আসামি আবু সালেককে খুঁজে বের করার বিষয়ে তৎপর ছিলেন, কিন্তু তিনি আবু সালেককে শনাক্ত করতে টাঙ্গাইল যাননি। সেলিনা আখতার মনির চাপে পড়ে ব্র্যাক ব্যাংকের অফিসার মো. ফয়সাল কায়েস যে ব্যক্তিকে আবু সালেক হিসেবে শনাক্ত করলেন, তাকেই সবাই আবু সালেক হিসেবে মেনে নিলেন। এখানে তদারককারীর কোনও কার্যকর ভূমিকাই দেখা যাচ্ছে না বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও তদারককারীরা আরও যত্নশীল হলে এ ধরনের ভুল হতো না। সেক্ষেত্রে তাদের ভুলটি সরল বিশ্বাসে হয়েছে, নাকি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হয়েছে, তা প্রমাণের বিষয়। আদালতই তা নির্ধারণ করতে পারেন।

প্রতিবেদনে জাহালমের শনাক্তকারী হিসেবে ৬ জনের নাম ও পরিচয় তুলে ধরা হয়েছে। তাদের প্রত্যেকেই জাহালমকে আবু সালেক হিসেবে শনাক্তের সঙ্গে জড়িত। তারা নিজেদের দায় এড়াতেই মূল অপরাধীর ছবির সঙ্গে কিছুটা সাদৃশ্য থাকা জাহালমকে মূল অপরাধী মো. আবু সালেক হিসেবে শনাক্ত করেছিলেন, যা গ্রহণযোগ্য নয়।

ভবিষ্যতে জাহালমের মতো ঘটনা রোধে তদন্ত কমিটির সুপারিশ:

সুপারিশগুলোতে বলা হয়, অপরাধলব্ধ অর্থ/সম্পদের গতিবিধি অনুসরণ করে মূল অপরাধী শনাক্ত করা ও অপরাধলব্ধ সম্পদ উদ্ধারের লক্ষ্যে উদ্যোগ নেওয়া, একটি ফরেনসিক অ্যাকাউন্টস ডিপার্টমেন্ট তৈরি, ফিন্যান্সিয়াল ট্রানজেকশন প্রোফাইল তৈরি ও প্রমাণের জন্য ফরেনসিক অ্যাকাউন্টস খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। এ বিষয়ে একটি টিম গঠন করাও যেতে পারে। একইসঙ্গে সাক্ষী বা আসামির পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয়পত্র প্রকল্পের তথ্যভাণ্ডার ব্যবহার করা যেতে পারে।

তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবিষ্যতে ভুলভাবে কাউকে আসামি করা হলে তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে তদারক কর্মকর্তাদেরও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। একই ঘটনায় একাধিক মামলা করা থেকে বিরত থাকারও সুপারিশ করা হয়। এতে আরও বলা হয়, জাহালম টাকার বিনিময়ে আসামি সেজে জেল খেটেছে বলে দুদকে পাঠানো বেনামি চিঠির বিষয়ে তদন্ত করতে হবে, মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করতে হবে, আইনজীবীদের দিয়ে মামলাটি আরও সঠিকভাবে পরিচালনা করতে হবে, গুরুত্বপূর্ণ আদেশ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুদককে জানাতে হবে।

উল্লেখ্য, সোনালী ব্যাংকের প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি টাকা জালিয়াতির অভিযোগে আবু সালেক নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৩৩টি মামলা করে দুদক। কিন্তু দুদকের ভুলে সালেকের বদলে বিনাদোষে তিন বছর কারাগারে কাটাতে হয়েছে নরসিংদীর পাটকল শ্রমিক টাঙ্গাইলের সন্তান জাহালমকে। রোববার (৩ ফেব্রুয়ারি) সোনালী ব্যাংকের ওই অর্থ জালিয়াতির মামলা থেকে অব্যাহতি দিয়ে হাইকোর্ট তাকে মুক্তি দেয়ার নির্দেশ দেন। কারাগারে কাগজ পৌঁছানোর পর গভীর রাতে জেল সুপার তাকে মুক্তি দেন

পূর্বপশ্চিমবিডি/জিএম