ঢাকা, রবিবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০১৮, ২ পৌষ ১৪২৬
BY  সাইফ ফয়সাল ১৬ নভেম্বর ২০১৮, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
প্রযুক্তির অবকাঠামোগত উন্নয়নে বদলে যাচ্ছে বিশ্ব। এমন অগ্রযাত্রায় খুব সহজেই অনুমান করা যায়, নিকট ভবিষ্যতে পৃথিবীজুড়ে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে হাজির হবে প্রযুক্তি। নতুন নতুন উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে আসবে মেডিক্যাল, যোগাযোগসহ দৈনন্দিন সব ক্ষেত্রে।

এরই মধ্যে বিশ্বব্যাপী শুরু হয়ে গেছে প্রযুক্তির বিপ্লব। চালকবিহীন গাড়ি, এআই সংবাদ পাঠকসহ এমন আরও শত কোটি উদ্ভাবন দেখা যাবে সামনের দিনগুলোতে, যা কেউ কল্পনাও করেনি আগে। কেমন হবে ২০৫০ সালে পৃথিবীর চিত্র, বিশেষজ্ঞরা কী ভাবছেন, মানুষের কল্যাণে কি বিস্ময় নিয়ে হাজির হবে প্রযুক্তি এসব নিয়ে আজকের আয়োজন।

বিজ্ঞানীরা মনে করছেন আগামী দিনের প্রযুক্তি পৃথিবীতে ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে হাজির হবে। সায়েন্স ফিকশনকেও যেন হার মানাবে নিত্যনতুন প্রযুক্তি। মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত ও সহজ হবে।

গবেষকদের মতে ২০৫০ সাল নাগাদ প্রযুক্তির মিলিত উৎকর্ষে মানুষের জীবনযাত্রা হবে অনেক বেশি চিত্তার্ষক। গাড়ি চালাতে লাগবে না চালক, প্রেমিকা না জুটলেও অসুবিধা নেই, মিলবে কৃত্রিম প্রেমিকা, চাইলেই হাতের নাগালে পাওয়া যাবে যে কোনো কিছু।

ইন্টারনেট

২০৫০ সাল নাগাদ ইন্টারনেট পৌঁছে যাবে বিশ্বের সর্বত্র। ব্যবহারকারী হবে বিশ্বের প্রায় সবাই। ফোরাম ফর দি ফিউচার ফাউন্ডারের গবেষক জোনাথন পোরিট ধারণা করছেন ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বের ৯৮ ভাগ বা ৮০০ কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করবে, যার অনেকেই সংযুক্ত হবেন মোবাইল ফোনের মাধ্যমে।

বর্তমানে বিশ্বের ৪০ শতাংশ লোক ইন্টারনেট সংযোগের আওতায় আছেন। গুগল, ফেসবুকসহ আরও অনেক তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যেই বিশ্বের সর্বত্র ইন্টারনেট ছড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

ফাইভজি

মোবাইল ফোনের পঞ্চম জেনারেশন ইন্টারনেটকে সংক্ষেপে ডাকা হয় ফাইভজি, যেখানে অনেক দ্রুতগতিতে ইন্টারনেট তথ্য ডাউনলোড এবং আপলোড করা যাবে। যার সেবার আওতা হবে ব্যাপক। এটা আসলে রেডিও তরঙ্গের আরও বেশি ব্যবহার নিশ্চিত করবে এবং একই সময় একই স্থানে বেশি মোবাইল ফোন ইন্টারনেটের সুবিধা নিতে পারবে।

পঞ্চম প্রজন্মের মোবাইল ইন্টারনেট বা ফাইভজি প্রযুক্তি বিশ্বে আলোড়ন তৈরি করবে বলেই মনে করেন প্রযুক্তি বিশ্লষকরা। ফাইভজি নেটওয়ার্ক বর্তমান থ্রিজি বা ফোরজির চেয়ে বহুগুণ দ্রুতগতিতে কাজ করবে।

মোবাইল তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান ওপেন সিগন্যালের কর্মকর্তা ইয়ান ফগ বলেন, ‘এখন আমরা আমাদের স্মার্টফোন দিয়ে যাই করি না কেন, ফাইভজি হলে তা আরও দ্রুতগতিতে করতে সক্ষম। চিন্তা করুন অগমেন্টেড রিয়েলিটি, মোবাইল ভার্চুয়াল রিয়েলিটি, উন্নতমানের ভিডিও- যেসব ইন্টারনেট এখনকার শহুরে জীবনকে আরও স্মার্ট করে তুলছে।

কিন্তু এমন অনেক নতুন সেবা আসবে, যা আমরা এখনও ভাবতে পারছি না।’ হয়তো ড্রোনের মাধ্যমে গবেষণা এবং উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনা হবে, অগ্নিনির্বাপণে সহায়তা করবে। বেশিরভাগ দেশ ২০২০ সাল নাগাদ ফাইভজি সেবা চালু করবে বলে মত দিয়েছে।

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষক ডেভিড লেভি বলছিলেন, এমন সময় আসবে যখন মানুষ রোবটের প্রেমে পড়বে এবং বিয়েও করবে রোবট-সঙ্গী বা রোবট-সঙ্গিনী। শুধু তাই নয়, এই বিয়ে আইনসম্মতও হবে।

এআই এর অনেক ব্যবহার ইতিমধ্যেই পরিলক্ষিত হয়েছে। এখন ভাবনার জায়গা তৈরি হয়েছে এ প্রযুক্তি ব্যবহারের সীমা নিয়ে। তবে কল্যাণজনক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে মানুষের জন্য জীবনযাপন অনেক সহজ হবে এমনকি সব জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করানো যাবে রোবট দিয়ে। সম্প্রতি চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া তাদের টেলিভিশন চ্যানেললে ‘এআই নিউজ রিডারের’ নিয়ে এসেছে। স্যুট টাই পরা ওই সংবাদ উপস্থাপককে দেখতে সম্পূর্ণ মানুষের মতো।

চালকবিহীন গাড়ি

২০৫০ সালের মধ্যে চালকবিহীন গাড়ির ব্যবহার প্রসারিত হবে বিশ্বব্যাপী। ফাইভজির অগ্রগতিতে দ্রুত যোগাযোগ স্থাপনের সুফলে ড্রাইভারলেস গাড়ি ব্যবহার হবে আনন্দের। গড়ে ওঠে স্মার্ট ভেহিকেল সিস্টেম। মিলকেন ইন্সটিটউটের তথ্য মোতাবেক ২০৩৫ সালের মধ্যেই পৃথিবীর সব গাড়ি হবে চালকমুক্ত।

মানবীয় ভুলের সম্ভাবনা না থাকায় এই সব চালকবিহীন গাড়ি হবে বেশি নিরাপদ। এ ছাড়া ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বে বৈদ্যুতিক গাড়ির জয়জয়কার হবে।

ইতালীয় জ্বালানি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ইনেলের মতে ২০৫০ সাল নাগাদ প্রতি বছর বিশ্বে ইলেক্ট্রিক গাড়ির উৎপাদন দাঁড়াবে ১০ কোটিতে। যা সারা বিশ্বের মোট কার্বন নিঃসরণের ৩০ শতাংশ হ্রাস করবে।

কোয়ান্টাম কম্পিউটার

অত্যন্ত দ্রুতগতির এই মেশিন, যা সুপার-ফাস্ট কম্পিউটার হিসেবে পরিচিত, ধারণা করা হচ্ছে, কম্পিউটিংয়ের ক্ষেত্রে এটি এক বিপ্লব ঘটাবে। এই কম্পিউটার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে ভবিষ্যতের কোয়ান্টাম জগৎ।

এবং অত্যাধুনিক সব কম্পিউটার দিয়েও যেসব সমস্যা সমাধান করা যাচ্ছে না, সেসবও সমাধান করা সম্ভব হবে এ কম্পিউটারের মাধ্যমে। কোয়ান্টাম কম্পিউটার বাণিজ্যিকভাবে সুলভ হলে সেটি হবে আজকের একটি সুপার কম্পিউটারের সমান সক্ষমতার। এ কম্পিউটার সিস্টেমের ওপর দাঁড়াবে পরবর্তী প্রজন্মের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, মেশিন লার্নিং, অগমেন্টেড রিয়েলিটি ও ইন্টারনেট অব থিংস।

ক্যাশলেস পৃথিবী

প্রযুক্তির কল্যাণে ২০৫০ সালে পৃথিবীতে ক্যাশ লেনদেন থাকবে না বলেই মত দেন বিশ্লেষকরা। ধারণা করা হচ্ছে সব ধরনের লেনদে অনলাইনে এবং মেশিনভিত্তিক হয়ে যাবে। সর্বক্ষেত্রে ক্যাশলেস লেনদেন প্রচলিত হবে। টাকা কেবল সংখ্যায় দেখা যাবে। হাতে হাতে টাকার দিন শিগগিরই ফুরাবে বলেও মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কাউকে টাকা ধার দিতে গেলেও করতে হবে অ্যাকাউন্ট টু অ্যাকাউন্ট ট্রান্সফার।

চিকিৎসা জগতে বিস্ময়

২০৫০ সালের মধ্যেই মানুষের মস্তিষ্ক মানচিত্র তৈরি ও বিশ্লেষণ করা সম্ভব হতে পারে। ফলে সহজেই মানুষের স্মৃতিশক্তি সংরক্ষণ করা ও চিন্তাশক্তির পূর্ণ ব্যবহারে যুগান্তকারী সাফল্য আসতে যাচ্ছে। মানুষের মস্তিষ্ক তখন কম্পিউটারের মতোই নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করা যাবে।

চাইলে যে কেউ তার স্মৃতি কম্পিউটারে জমা করে রাখতে পারবে। অঙ্গ প্রতিস্থাপনেও দেখা মিলবে অবিশ্বাস্য প্রযুক্তির। আজকের পৃথিবীতে যা অবিশ্বাস্য ২০৫০ সালে তা হবে একেবারেই সাদামাটা ব্যাপার। এখন মানুষের হাত-পা প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। কিডনি প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে।

এ ধারা অব্যাহত থেকে আরও উন্নত হবে চিকিৎসা জগৎ। তখন মানুষের হৃৎপিণ্ড ও মস্তিষ্ক প্রতিস্থাপনেও সাফল্য আসতে পারে। রোবটিক হাত-পা ব্যবহার করতে পারবে মানুষ।

অগমেন্টেড রিয়েলিটি

অগমেন্টেড রিয়েলিটির ব্যবহারের ব্যাপকতা দেখা যাবে। গুগল, অ্যাপল, আসুসের মতো বড় বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সাম্প্রতিক সময়ে তাদের স্মার্টফোনে অগমেন্টেড রিয়েলিটি চালু করেছে। এটা নিশ্চিতভাবে নির্দেশ করছে আগামী দিনগুলোয় অগমেন্টেড রিয়েলিটি আরও সুদূরপ্রসারী ও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হবে। কারণ বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো ফলো করবে।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হল সফটওয়্যার নির্মিত একটি কাল্পানিক পরিবেশ যা ব্যবহারকারীর কাছে বাস্তব জগৎ হিসেবে বিবেচিত হয়। ভবিষ্যতে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি অনেক বেশি সহজলভ্য হয়ে যাবে, তখন তা বিনোদন থেকে শুরু করে যোগাযোগ পর্যন্ত প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হবে। বিভিন্ন পেশা ও গবেষণায় ভার্চুয়াল রিয়েলিটির প্রয়োগের ফলে সমাজে এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক উভয় ধরনের প্রভাব পড়বে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন।

ড্রোন

ধারণা করা হচ্ছে ২০৫০ সালের মধ্যে ড্রোন একটি মেইনস্ট্রিম প্রযুক্তিতে রূপ নেবে। এবং বিভিন্নরকম ড্রোনের বিভিন্ন রকম ব্যবহার দেখা যাবে, ডেলিভারি ড্রোন এমনকি মনুষ্যবাহী ড্রোনও দেখা যাবে। অ্যামাজন, আলিবাবাসহ বিশ্বের সব বড় রিটেল কোম্পানি পণ্য ডেলিভারির জন্য ড্রোন ব্যবহার করবে। সিনেমার শুটিংয়ের জন্যও এর বহুল ব্যবহার হবে।

বলা যায় ২০৫০ সালের পৃথিবী আজকের পৃথিবী থেকে অনেক অংশেই এগিয়ে থাকবে। তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে, জীবনযাত্রার মান আরও অনেক উন্নত হবে।