ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ আগস্ট ২০১৯, ৭ ভাদ্র ১৪২৭
BYআদর রহমান
২২ জুলাই ২০১৯, ১৩:৫৬

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম এখন বলা যায় বুড়োবুড়ির দখলেই। তবে যেসব বুড়োকে দেখা যাচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, প্রকৃতপক্ষে তাঁরা প্রকৃত বুড়ো নন। ফেসঅ্যাপ নামের একটি অ্যাপ্লিকেশন তরুণ বয়সের ছবিকে একেবারে বার্ধক্যের রূপ দিচ্ছে বাস্তবসম্মত করেই। অনলাইন দেখে মনে হচ্ছে, নিজেকে বুড়ো বানানোই যেন এই সময়ের ধারা। কিন্তু কেন? এ নিয়ে এবারের প্রতিবেদন। যেন একটা অদ্ভুত সময়যানে চড়ে ৪০-৫০ বছর এগিয়ে গেছি আমরা। ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামের দেয়ালজুড়ে এখন বুড়িয়ে যাওয়া চেনামুখের ছড়াছড়ি। গতকালও যাদের হাসিতে ছিল তারুণ্য আর প্রাণ, সেই চেহারায় বলিরেখার ভিড়। ‘ফেসঅ্যাপ’ এভাবেই আমাদের ভবিষ্যতের বুড়ো হয়ে যাওয়া পৃথিবীর ঝলক দেখিয়ে দিচ্ছে। আর আমরাও হুজুগে শামিল হয়ে নিজেদের ভবিষ্যৎ রূপ দেখে নিচ্ছি। হালের আলোচিত এই অ্যাপ আর আমাদের বার্ধক্যপ্রীতি নিয়ে আজকের এই আয়োজন।

‘ফেসঅ্যাপ’ কিন্তু আজকের বিষয় নয়। এই অ্যাপ ২০১৭ সালেও আলোড়ন তুলেছিল। কারণ, সেবারই প্রথম কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স—এআই) ব্যবহার করে মানুষের বর্তমান ছবিকে আরও তরুণ, আরও বুড়ো, ছেলে হলে মেয়েতে আবার মেয়ে হলে ছেলেতে বদলে ফেলতে পারত। কিন্তু আর দশটা হুজুগে অ্যাপের মতো এই অ্যাপও কিছুদিন সাড়া ফেলে আবার হারিয়ে ফেলে এর তেজ। কিন্তু ২০১৯-এ এসে আবারও ফেসঅ্যাপ উঠে আসে আলোচনায়। এবার শুধু বার্ধক্যকে পুঁজি করেই ভাইরাল হয়েছে অ্যাপটি। একদিকে যেমন দারুণ সাড়া ফেলেছে বিশ্বজুড়ে, অন্যদিকে এটি তৈরি করেছে আতঙ্কও। তবে সব মিলিয়ে বর্তমানে বসে ভবিষ্যৎ দেখে ফেলা মানুষেরা কিন্তু বেশ উপভোগই করছেন এই বার্ধক্য। তবে এরই মধ্যে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন, অনলাইনে ব্যক্তির নিরাপত্তা নিয়ে অভিযোগের তির ছুটে গেছে ফেসঅ্যাপের দিকে।

যেভাবে শুরু২০১৭ সালে আট মাস সময় নিয়ে তৈরি করা হয় ফটো-রিয়েলিস্টিক ফেস-মর্ফিং ঘরানার একটি অ্যাপ। ওয়্যারলেস ল্যাব নামে রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গের ছোট্ট একটি প্রতিষ্ঠান এই অ্যাপ বানায় এবং এর নাম দেওয়া হয় ফেসঅ্যাপ। শুরুতে এটি শুধু ছিল একটি আইওএস অ্যাপ, মানে শুধু আইফোন, আইপ্যাডে ব্যবহার করা যেত। পরে অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমেও অ্যাপটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। রাশিয়ায় তৈরি হলেও এই অ্যাপের সার্ভার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক। তা ছাড়া অ্যাপটি পরিচালনায় তৃতীয় পক্ষের (থার্ড পার্টি) কোডও লাগে। সেই থার্ড পার্টির সার্ভারগুলো রয়েছে আয়ারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও অস্ট্রেলিয়ায়।গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত গুগল প্লে স্টোরের টপ ফ্রি অ্যাপ ও ট্রেন্ডিংয়ের তালিকায় ফেসঅ্যাপ ছিল এক নম্বরে। ১০ কোটির বেশিবার এটি নামিয়েছেন অ্যান্ড্রয়েড ব্যবহারকারীরা। অন্যদিকে আইওএস অ্যাপ স্টোরেও এটি ফটো ও ভিডিও ক্যাটাগরির এক নম্বরে আছে। অ্যাপ অ্যানি নামের একটি প্রযুক্তি সংস্থার হিসাবে, ১২১টি দেশের আইওএস ব্যবহারকারীদের মধ্যে ফেসঅ্যাপ এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়। তবে ফেসঅ্যাপের এই হিসাব আর কত দূর এগোবে, সে ব্যাপারে প্রযুক্তি গবেষকেরা এখনই কিছু বলতে চাইছেন না।বুড়ো হওয়ার যত আনন্দসদ্য বিবাহিত দম্পতি ফেসবুকে লিখেছেন, ‘একসঙ্গে বুড়ো হতে চাই।’ এটা তো সচরাচর দেখাই যায়। কিন্তু লেখাটির সঙ্গে তাঁরা জুড়ে দিয়েছেন তাঁদের বুড়ো হয়ে যাওয়া ছবি। অন্যদিকে প্রায় ৫০-এর কোটা ছুঁয়ে যাওয়া এক ফেসবুক ব্যবহারকারীও নিজেকে আরও বুড়ো বানানোর জন্য ফেসঅ্যাপ ব্যবহার করে লিখেছেন, ‘যদি ১০০ বছর বাঁচি, তাহলে কেমন হবে?’ এই এক ফেসঅ্যাপ এখন মানুষের মনে বার্ধক্য নিয়ে এমন অদ্ভুত সব ভাবনার উদ্রেক করছে, যেখানে চিরতরুণ থাকার জন্য মানুষ কতই না চেষ্টা করেন, সেখানে এক ফেসঅ্যাপ পেয়ে যৌবনকেই ভুলতে বসেছেন অনেকে। তারুণ্যের সবুজ এখন ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামের পাতার ধূসর বার্ধক্যে ঢেকে গেছে। এমনকি ছোট ছোট স্কুলপড়ুয়াও তাদের দুরন্ত ছবিতে বার্ধক্যের বলিরেখা টেনে দারুণ আনন্দ পাচ্ছে।তারকাদের তারকাফেসঅ্যাপ নিয়ে তো আর আলোচনার কমতি নেই। এই অ্যাপ ব্যবহার করে বুড়ো হওয়ার প্রতিযোগিতাও শুরু হয়ে গেছে, যাকে বলা হচ্ছে ফেসঅ্যাপ চ্যালেঞ্জ। শুরুতে সাধারণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল চ্যালেঞ্জটি। তবে এত সময় এটা সাধারণের গণ্ডি পেরিয়ে তারকামহলে ছড়িয়ে পড়ে। আর তারকাদের বদৌলতে এটি হয়ে ওঠে আরও জনপ্রিয়। হলিউড, বলিউড, এমনকি বাংলাদেশের তারকারাও দলে দলে শামিল হয়েছেন এই প্রতিযোগিতায়। মার্কিন র​্যাপার ড্রেক, অভিনেত্রী হিলারি ডাফ, বলিউড অভিনেতা অর্জুন কাপুর, বরুণ ধাওয়ান, আয়ুষ্মান খুড়ানা—সবাই নিজের বুড়িয়ে যাওয়া চেহারা তুলে ধরতে মোটেও পিছপা হচ্ছেন না। বাংলাদেশের অভিনেতা আরিফিন শুভ, সংগীতশিল্পী প্রীতম, অভিনেত্রী সোনিয়া হোসেন—সবাই শামিল হয়েছেন এই ফেসঅ্যাপ আলোড়নে।

কেন এমন বুড়ো হওয়ার শখ হলো? জানতে চেয়েছিলাম এই সময়ের তরুণ সংগীতশিল্পী প্রীতমের কাছে। সহজ জবাব তাঁর, ‘সামনে গিয়ে একটা সময় হয় আমরা বুড়ো হব কিংবা বুড়ো হওয়ার আগে মারা যাব। এটাই বাস্তবতা। তাই সুযোগ পেয়ে সেই বাস্তবতাকেই দেখে নিলাম।’ এমন ভাবনা থেকেই হয়তো আরও অনেকে এই ফেসঅ্যাপ চ্যালেঞ্জে শামিল হয়েছেন। নিজে তো বুড়ো হয়েছেনই, বুড়ো হওয়ার প্রতিযোগিতায় টেনে এনেছেন বন্ধু-স্বজন ও কাছের মানুষদেরও।একটা কিছু যখন এমনভাবে হুট করে বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়ে, তখন মনের কোথাও একটু তো সন্দেহ জাগতেই পারে, দানা বাঁধতে পারে নানা ধরনের আতঙ্ক। ফেসঅ্যাপের বেলায়ও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বলিউড অভিনেত্রী সোনাক্ষী সিনহা গত শুক্রবার তাঁর ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে ফোর্বস-এর একটি প্রতিবেদনের অংশ প্রকাশ করেন। সেই প্রতিবেদনে লেখা ছিল, ‘ফেসঅ্যাপ এরই মধ্যে প্রায় ১৫ কোটি ব্যবহারকারীর নাম ও স্বত্ব অনির্দিষ্টকালের জন্য নিজেদের করে নিয়েছে। এই অ্যাপ ব্যবহারকারীরা তাঁদের নাম, পরিচয় ও ছবির মালিকানা তুলে দিচ্ছেন একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের হাতে, যারা এটা দিয়ে যা ইচ্ছা তা-ই করতে পারবে।’

কতটা নিরাপদ?আসলেই কি আমাদের ছবি আর নাম নিয়ে যা ইচ্ছা তা-ই করবে ফেসঅ্যাপ? এমন প্রশ্ন সাধারণের মাথায় দানা বাঁধতেই পারে। তাঁদের জন্য বলে রাখি, আসলেই পারে। ফেসঅ্যাপ ব্যবহারের সময় ব্যবহারকারীরা যে ‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন’-এর সঙ্গে সম্মত হয়েছেন, তাতে উল্লেখ আছে ব্যাপারটা। অর্থাৎ আপনার ছবিটি যদি ফেসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষ কোনো বাণিজ্যিক প্রচারের জন্য অনুমতি ছাড়াই বিলবোর্ড, পোস্টার বা বিজ্ঞাপনচিত্রে ব্যবহার করে, তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। প্রতি সেকেন্ডে যখন হু হু করে বাড়ছে ফেসঅ্যাপের ব্যবহারকারীর সংখ্যা, তখন এই অ্যাপের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যবচ্ছেদে নামেন বিভিন্ন দেশের প্রযুক্তিবিদেরা। জশুয়া নজ্জি নামের এক প্রোগ্রামার হঠাৎ টুইটারে বোমা ফাটানোর মতো একটি টুইট করেন। লেখেন, ‘ফেসঅ্যাপ থেকে সাবধান—চেহারা, বয়স বাড়িয়ে দেওয়ার যে ফ্যাড অ্যাপটি আছে, সেটার কথা বলছি। এটা আপনার মুঠোফোনের সব ছবি নিজেদের সার্ভারে নিয়ে নিচ্ছে, আপনার অনুমতি ছাড়াই।’ তবে এক দিন পরই নিজের কথার সুর পাল্টে ফেলেন তিনি। বলেন যে বিস্তর গবেষণা না করে, ঝোঁকের বশে ওই টুইটটি করেছিলেন তিনি। ফেসঅ্যাপ আসলে সব ছবি নিজেদের সার্ভারে নিয়ে রাখে না। তারা শুধু ওই ছবিই নিজেদের সার্ভারে তুলে নেয়, যেটার বয়স বদলাতে চান ব্যবহারকারী। কিন্তু জশুয়া পরে নিজের বক্তব্য থেকে সরে এলেও ফেসঅ্যাপকে ঘিরে সবার সন্দেহ বাড়তে থাকে। ফেসঅ্যাপের ‘টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন’ নিয়ে অনেক বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে জানা যায়, ওই অ্যাপ ব্যবহারের মাধ্যমে আপনি ফেসঅ্যাপে আপলোড করা নিজের ছবিটির সব স্বত্ব দিয়ে দিচ্ছেন তাদের। ফেসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষ চাইলেই আপনার ছবি, আপনার নাম ব্যবহার করতে পারবে যেকোনো ধরনের প্রচারণা বা বিপণনের কাজে। অর্থাৎ ফোনের সব ছবি না হলেও আপনার মৌলিক তথ্য ও আপনার নির্বাচিত ছবি নিজেদের সার্ভারে সংরক্ষণ করে রাখছে ফেসঅ্যাপ।কৌতূহল থেমে থাকার নয়তবে প্রযুক্তির এত কঠিন কঠিন ভাবনা কয়জনই-বা ভাবেন। বরং সবাই নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। ভবিষ্যতে মাথায় চুল থাকবে তো? বলিরেখার ভারে কি খুব বেশি ঝুলে পড়বে গাল দুটো? ৫০ বছর পর কটা দাঁত থাকবে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ফেসঅ্যাপে ঢুঁ মারছেন নানা বয়সী, নানা দেশের কৌতূহলী মানুষেরা। কেউ একটা ছবিকে বুড়ো বানিয়েই থেমে যাচ্ছেন, কেউ আবার নিজের ছবির পাশাপাশি বন্ধু, প্রিয় মানুষ, পরিবার, প্রিয় তারকাদের ছবিও নিজ তাগিদে ফেসঅ্যাপে দিয়ে বয়স বাড়িয়ে দারুণ আনন্দ পাচ্ছেন। এভাবেই চলছে হালের ট্রেন্ড ‘ফেসঅ্যাপ’। এটাও হয়তো কিছুদিনের মধ্যে আলোচিত প্রিজমা অ্যাপের মতো স্মৃতির খাতায় নাম লেখাবে। বছর পেরোলে শুধু ‘অন দিজ ডে’ হয়েই ফিরে আসবে চোখের সামনে। কিন্তু এর আগ পর্যন্ত কয়েকটা দিন মানুষ থাকুক না বয়স বাড়ানোর এই খেলা নিয়ে।সূত্র: সিএনএন, ফোর্বস, টেকক্রাঞ্চ