ঢাকা, শনিবার, ২১ এপ্রিল ২০১৮, ৮ বৈশাখ ১৪২৫
BYতারেক মাহমুদ
১৭ এপ্রিল ২০১৮, ১২:৩৭
বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের একটি টয়লেটকে ক্রিকেটের ঘর বানিয়েছেন স্থানীয় কোচ মুসলিম উদ্দিন

টয়লেট: এক প্রেমকথা দিয়ে মাত হয়ে গেছে বলিউড। বাংলাদেশেও সে রকম একটা ছবি হলে কেমন হয়? যার নাম হবে, ‘টয়লেট: ক্রিকেটের এক বসত’।

বলিউডের ছবিতে টয়লেটের সঙ্গে ভারতে বহুদিন ধরে চলে আসা একটা সংস্কারের বিরোধ লেগে গিয়েছিল। কিন্তু বগুড়ার ১৫ কিশোরী সেই টয়লেটকেই করে নিয়েছে আপন, ছোট্ট একটি টয়লেটকে ঘিরে বড় হচ্ছে তাদের ক্রিকেটার হয়ে ওঠার স্বপ্ন।

বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের এই টয়লেটের আয়তন সব মিলিয়ে ৩৫-৪০ বর্গফুট হবে। স্টেডিয়ামের টয়লেট যে রকম হয়, ছোট ছোট তিনটি ঘরে কমোড বসানো। সামনে একচিলতে জায়গায় দু-তিনটি বেসিন, পানির কল, দেয়ালে আয়না। কিন্তু ঘরটাতে ঢোকার পর কেউ বলে না দিলে বোঝার উপায় নেই, এটি আসলে একটি টয়লেট। নানা রকমের বল-ব্যাট, স্টাম্প, নেট, প্যাডসহ আরও কত রকমের ক্রিকেটীয় সরঞ্জামে যে ঠাসা! কমোডগুলো ব্যবহৃত হচ্ছে এসব রাখার ‘টেবিল’ হিসেবে। ফ্ল্যাশের ওপর রাখা ফুলদানিতে ফুল, দেয়ালে ক্রিকেট আর ক্রিকেটারদের ছবি। বেসিনভর্তি বল। ছোট্ট এই ঘরে যেন ঢুকে গেছে ক্রিকেটের দুনিয়াটাই! দেয়ালের একটা জায়গায় চোখ আটকে গেল। সেখানে লেখা, ‘দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, জীবন বদলে যাবে।’

একটা টয়লেটকে ক্রিকেটের আবাস হিসেবে গড়ে তোলার চিন্তাটা আসে বগুড়া জেলা ক্রীড়া সংস্থার সহকারী কোচ মোহাম্মদ মুসলিম উদ্দিনের মাথায়। ২০০৭ সালে মহিলা ক্রীড়া সংস্থার মাধ্যমে বগুড়ার মেয়েদের ক্রিকেটের দেখভালের দায়িত্ব পান। দু-তিন মাস পর মহিলা ক্রীড়া সংস্থা সে কাজ থেকে সরে গেলেও মুসলিম উদ্দিন ছেড়ে যাননি বগুড়ার কিশোরী ক্রিকেটারদের। মাঝে কয়েক বছর জেলা ক্রীড়া সংস্থার সঙ্গেও ছিলেন না। মেয়েদের খেলা শেখানোর কাজটা তবু চালিয়ে গেছেন। মেয়েদের জাতীয় দলে খেলা খাদিজাতুল কুবরা, রিতু মণি, শারমিনরা তাঁর হাতেই তৈরি।

সমস্যা বাধে খেলার সরঞ্জাম রাখার জায়গা নিয়ে। অনুশীলন করতে এসে মেয়েরা একটু বসবে, কথা বলবে—সে রকম একটা জায়গা তো চাই! তারা যেখানেই একটু থিতু হয়, কিছুদিন পর জায়গাটি নিয়ে নেওয়া হয় অন্য কোনো কাজের জন্য। শেষ পর্যন্ত আর কোনো উপায় না দেখে মুসলিম উদ্দিন জেলা ক্রীড়া সংস্থার কাছ থেকে চেয়ে নেন ওই টয়লেটটা। আর যা-ই হোক, টয়লেট তো কেউ কেড়ে নেবে না! টয়লেটে ক্রিকেটের বসত গড়া নিয়ে মুসলিম উদ্দিন বলছিলেন, ‘আগে অন্য রুমে ছিলাম। সেখান থেকে আমাকে সরে যেতে হয়। এই টয়লেটটা যেহেতু ব্যবহার হচ্ছিল না, আমি তখন এটা চেয়ে নিই। আমি ও আমার মেয়েরা মিলে রুমটা খুব সুন্দর করে সাজিয়েছি। বছর তিনেক ধরে এখানেই এখন আমাদের সবকিছু থাকে।’

মুসলিম উদ্দিনের ছাত্রীদের একজন বৃষ্টি। ‘টয়লেটে’ দাঁড়িয়েই বলছিল, ‘আমরা এটাকে টয়লেট ভাবি না। স্যার এখানে এনে আমাদের বলেছেন, এটাই আমাদের ঠিকানা। তখন থেকে এটাই আমাদের পৃথিবী, এটাই আমাদের আকাশ।’ বৃষ্টি বা তার সতীর্থদের এ নিয়ে কোনো অভিযোগ তো নেই-ই, উল্টো সবার এক কথা—‘আমরা এখান থেকে কোথাও যেতে চাই না। এখানেই থাকতে চাই।’

ক্রিকেটের বসতে ঢুকে মুসলিম উদ্দিনের আরও কিছু সৃষ্টিশীল চিন্তার ছাপ পাওয়া গেল। অনুশীলনের জন্য অপরিহার্য বেশ কিছু উপকরণ তিনি অনেক কম খরচে স্থানীয়ভাবে তৈরি করে নিয়েছেন। এসব জিনিস জাতীয় দল বা ঘরোয়া ক্রিকেটের দলগুলো উচ্চমূল্যে বাজার থেকে কেনে। অনেক সময় বিদেশ থেকেও আনাতে হয়। উইকেটকিপিং অনুশীলনের বিশেষ একধরনের ব্যাট দেখাতে দেখাতে মুসলিম উদ্দিন বলছিলেন, ‘বিদেশ থেকে যেসব জিনিস আনা হয়, আমি নিশ্চিত, আমার জিনিসগুলো দিয়ে তার অন্তত ৭০ ভাগ কাজ হয়।’ তবে একটা জিনিস চাইলেও বানানো সম্ভব নয় তাঁর পক্ষে। সেটা হলো বোলিং মেশিন। কোচ খুব করে বললেন, কেউ যদি মেয়েদের অনুশীলনের জন্য একটা বোলিং মেশিনের ব্যবস্থা করে দিতেন, খুব ভালো হতো।

বিসিএলের ম্যাচ দেখতে বগুড়ায় গিয়ে নির্বাচক হাবিবুল বাশার রীতিমতো অবাক মুসলিম উদ্দিন আর তাঁর ছাত্রীদের ক্রিকেটের আবাস দেখে। অনুশীলন নিয়ে মুসলিম উদ্দিনের সৃষ্টিশীল চিন্তাভাবনায়ও মুগ্ধ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক, ‘উনি ভেবেচিন্তে যেসব জিনিস তৈরি করেছেন, এগুলো খুব কাজের। এসব যে স্থানীয়ভাবে বানানো যায়, এটা দেখে আসলেই অবাক হয়েছি। আন্তর্জাতিক দলগুলো যেসব জিনিস ব্যবহার করে, সেগুলোর সঙ্গে এসবের খুব বেশি পার্থক্য দেখলাম না।’

ক্রিকেটের ছোট্ট দুনিয়া থেকে বের হওয়ার সময় আবারও চোখে পড়ল লেখাটা, ‘দৃষ্টিভঙ্গি বদলান, জীবন বদলে যাবে।’ বলিউডের ‘টয়লেট’ই বলুন বা শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের—বার্তা তো আসলে এটাই।