ঢাকা, রবিবার, ২২ জুলাই ২০১৮, ৭ শ্রাবণ ১৪২৬

গোল্ডেন গ্লাভসের রেসে যে সকল গোলরক্ষক

http://www.rtvonline.com/sports/46400/গোল্ডেন-গ্লাভসের-রেসে-যে-সকল-গোলরক্ষক
BYস্পোর্টস ডেস্ক, আরটিভি অনলাইন|  ১৩ জুলাই ২০১৮, ০৯:২১ | আপডেট : ১৩ জুলাই ২০১৮, ১৩:৩৪

রাশিয়ায় চলমান বিশ্বকাপ নাটকীয়তায় ভরপুর এক বিশ্বকাপ। এ আসরে অংশ নিয়ে কোনওদল হেরেছে রক্ষণের ভুলে, কোনওদল হেরেছে ফরোয়ার্ডের ব্যর্থতায়, আবার কোনওদল হেরেছে গোলরক্ষকের শিশুসুলভ ভুলের কারণে। তবে ২৪ ফিট লম্বা এবং ৮ ফিট উচ্চতার গোলপোস্টের নিচে গোলরক্ষকদের বীরত্বেও কোনওকোনওদল ম্যাচ জিতে নিয়েছে। ফিফা বিশ্বকাপে গোলপোস্টের নিচে এই বীরদের মধ্যে থেকে শ্রেষ্ঠ বীরকে নির্বাচিত করা হয় এবং তাকে পুরস্কার হিসেবে দেয়া ইয় ‘গোল্ডেন গ্লাভস’। বিশ্বকাপ কে জিতবে সেটা নিয়ে যেমন ফাইনালের আগেই প্রচুর হিসাব-নিকাশ চলে, তেমনি ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলো জয়ের দৌড়ে কারা এগিয়ে রয়েছেন তা নিয়েও চিন্তা-ভাবনার কমতি থাকে না ফুটবল ভক্তদের মাঝে। রাশিয়া বিশ্বকাপ থেকে ইতোমধ্যে ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, জার্মানি এবং স্পেনের মতো ফেবারিট দলের বিদায় হয়ে গেছে।

নিশ্চিত হয়ে গেছে ফাইনালের শেষ দুটি দল। তাদের মধ্যে থেকে কে বিশ্বকাপ জিতবে সেটা জানা যাবে ফাইনাল ম্যাচ শেষ হওয়ার পর, তেমনি কোন খেলোয়াড় গোল্ডেন বল কিংবা গোল্ডেন গ্লাভস জিতবেন সেটাও জানা যাবে ফাইনালের পরে। ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ পুরষ্কারটি দেয়া হয় টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষককে তবে গোলরক্ষকদের জন্য শুধুমাত্র গোল্ডেন গ্লাভস পুরস্কার সেটা নয়, তারা গোল্ডেন বলও জিততে পারেন।

২০০২ সালে জার্মানির কিংবদন্তী গোলরক্ষক টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে ‘গোল্ডেন বল’ জিতে নেন অলিভার কান। ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ পুরস্কারটি ১৯৯৪ সাল থেকে কিংবদন্তী সোভিয়েত গোলরক্ষক লেভ ইয়াসিনের সম্মানে প্রদান করা হয়। প্রথমে লেভ ইয়াসিন অ্যাওয়ার্ড নামে পরিচিত হলেও ২০১০ সালে এটির নাম পরিবর্তন করে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ রাখা হয়। মূলত বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্ব থেকে নক-আউট ফাইনাল পর্যন্ত যে সকল গোলরক্ষক সবচেয়ে বেশি সেভ করেন কিংবা টাইব্রেকারে সবচেয়ে ভালো করেন এমন কয়েকজন গোলরক্ষকে নাম প্রস্তাব করে ফিফার টেকনিক্যাল কমিটি।

সেখান থেকে সেরা গোলরক্ষককে এই পুরস্কারটি দেয়া হয়। ২০১৮ বিশ্বকাপে রাশিয়া বিশ্বকাপে গোলপোস্টের নিচে বেশ কয়েকজন গোলরক্ষককে দেখেছে যারা দানবীয় কিছু সেভ করে দলকে রক্ষা করেছেন। তাদের মাঝে থেকেই সেরা গোলরক্ষককে বেছে নেয়া হবে। তবে চলুন জেনে আসি, ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ জয়ের দৌড়ে কোন কোন গোলরক্ষক এগিয়ে রয়েছেন।

থিবো কোর্তোয়া (বেলজিয়াম) ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে চেলসির হয়ে গোলপোস্টের নিচে বেশ আস্থার পরিচয় দিয়েছেন বেলজিয়ান গোলরক্ষক থিবো কোর্তোয়া। ক্লাবের পরে এবার তিনি রাশিয়া বিশ্বকাপে দেশের হয়েও গোলপোস্টের নিচে আস্থার প্রতীক হিসেবে নিজেকে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন। এমনিতে বেলজিয়ামের ডিফেন্স একেবারে নিরেট সেই সাথে গোলপোস্টের নিচে চীনের প্রাচীর মতো থিবো কোর্তোয়ার উপস্থিতি প্রতিপক্ষের জন্য গোল করা হুমকিতে কষ্টসাধ্য হয়ে পড়েছে।

একমাত্র জাপানের বিপক্ষে ম্যাচটি ব্যতীত অন্য ম্যাচগুলোতে অসাধারণ পারফর্ম করেছেন থিবো কোর্তোয়া। বিশেষ করে কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে তার কীর্তি এখন সবার মুখে মুখে। ব্রাজিলের বিপক্ষে থিবো কোর্তোয়া একটি নয় মোট নয়টি সেভ করেছেন। ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দেয়ার অন্যতম কারিগর এই থিবো কোর্তোয়া।

এছাড়া জাপানের বিপক্ষে শেষ মূহূর্তের গোলে জয়ের পিছনেও তার যথেষ্ঠ অবদান রয়েছে। তিনি জাপানের শট তালুবন্দী করে বিন্দুমাত্র দেরি না করে বল পাস করে দেন। সেটি থেকে পরবর্তীতে শাদলি গোল করে দলকে জয় এনে দিয়েছে। বেলজিয়ামের গোলপোস্টের নিচে তার উপস্থিতির কারণে সেট পিস থেকে রেড ডেভিলসের বিপক্ষে গোল করা অসাধ্য হয়ে পড়েছে। ৫ ম্যাচের ২টিতে তিনি ক্লিনশীট বজায় রেখেছেন। থিবো কোর্তোয়ার এই কীর্তিগুলো তাকে রাশিয়া বিশ্বকাপে সেরা গোলরক্ষকের পুরস্কার ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ জয়ের দৌড়ে এগিয়ে রাখছে।

ড্যানিয়েল সুবাসিচ (ক্রোয়েশিয়া) ক্রোয়েশিয়ান গোলরক্ষক ড্যানিয়েল সুবাসিচ টাইব্রেকারে দলকে একবার নয়, দুই দুইবার জয় উপহার দিয়েছেন। বিশ্বকাপের সবচেয়ে অভিজ্ঞ এই গোলরক্ষক তার অভিজ্ঞতার ঝুলি দিয়ে মারিও মানজুকিচ-লুকা মডরিচদের পাশাপাশি সেরা পারফর্মার হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন। তার দিনে তিনি কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারেন সেটি তিনি দেখিয়েছেন দ্বিতীয় রাউন্ডে ডেনমার্কের বিপক্ষে। ডেনমার্কের বিপক্ষে টাইব্রেকারে এক-দুইটি নয়, মোট তিনটি পেনাল্টি শট ঠেকিয়ে ক্রোয়েশিয়াকে কোয়ার্টার ফাইনালে তুলেছেন।

কোয়ার্টার ফাইনালে রাশিয়ার বিপক্ষে আবারও টাইব্রেকার, আবারও সুবাসিচের অনবদ্য পারফর্ম। তিনি রাশিয়ার প্রথম পেনাল্টি ঠেকিয়ে দলকে সেমিফাইনালে নিয়ে গেছেন। সেই সাথে এক বিশ্বকাপে মোট ৪টি পেনাল্টি ঠেকিয়ে রেকর্ড স্পর্শ করেছেন। মোট ৫ ম্যাচে ২টি ক্লিনশিট আছে তার। এছাড়া তিনি ৯০ ভাগ শট সেভ করেছেন। এছাড়া তিনি অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ পাসও দিয়েছেন। তবে সবকিছু ছাপিয়ে গেছে তার টাইব্রেকার কীর্তি। সামনের ম্যাচে তিনি আরও কি করবেন সেটা সময়ই বলে দিবে। তবে এবারের বিশ্বকাপে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ এর বড় দাবিদার সুবাসিচ।

মুসলেরা (উরুগুয়ে) মুসলেরা বেশ কয়েক বছর ধরে উরুগুয়ের গোলপোস্ট সামলাচ্ছেন। তবে রাশিয়া বিশ্বকাপে আরো ভালোভাবে সামলেছেন। যদিও তার সব কৃতিত্ব শেষ ম্যাচে এসে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে গেছে। কোয়ার্টার ফাইনালে তার ভুলের কারণে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার দল গোল দ্বিতীয় গোলটি হজম করেছে। তবে তার আগের চার ম্যাচের ৩ ম্যাচে তার ক্লিনশিট ছিলো এবং তিনি ৯১% শট সফলভাবে ঠেকিয়েছেন।

অধিনায়ক দিয়েগো গডিন–গিমিনেজের জমাট রক্ষণ এবং মুসলেরার গোলকিপিং উরুগুয়েকে একেবারে দুর্ভেদ্য করে তুলেছিলো। ছোট এক ভুলের কারণে একটি গোল হজম করলেও তার কৃতিত্বগুলো প্রশংসার দাবিদার। তাই ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ জয়ের দৌড়ে তার নামও থাকবে।

অ্যালিসন (ব্রাজিল) ব্রাজিলিয়ান গোলরক্ষক অ্যালিসন রাশিয়া বিশ্বকাপে দারুণ পারফর্ম করেছেন। গ্রুপ পর্বের প্রথম ম্যাচে সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে তার দৃঢ়তার কারণেই ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ১-১ গোলে ড্র হয়েছে। গোলপোস্টের নিচে তার অসাধারণ পারফর্মেন্স থিয়াগো সিলভা-মিরান্ডাদের কাজ আরো সহজ করে দিয়েছে। তিনি নির্ভরতা এবং সাহসের সাথে রক্ষণ সামলেছেন। অ্যালিসন ৫ ম্যাচের মধ্যে ৩ ম্যাচে কোনো গোল হজম করেননি।

তার উচ্চতার কারণে তাকে ফাঁকি দিয়ে সেট পিস থেকে গোল করা একেবারে কঠিন। তবে শেষ পর্যন্ত তার দল বেলজিয়ামের কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিলেও তার সম্ভাবনা রয়েছে ব্যক্তিগত পুরস্কার ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ জয়ের।

হুগো লরিস (ফ্রান্স) ফরাসি গোলরক্ষক একই সাথে টটেনহাম হটস্পারস এবং ফ্রান্সের অধিনায়কত্ব করছেন। তিনি ক্লাব ফুটবলে যেমন নিজের প্রতি ভক্ত-সমর্থকদের আস্থা তৈরি করতে পেরেছেন, তেমনি দেশের হয়ে রাশিয়া বিশ্বকাপেও দারুণ করছেন। কোয়ার্টার ফাইনালে উরুগুয়ের বিপক্ষে তার পারফর্মেন্স সবার নজর কেড়েছে। উরুগুয়ের মার্টিন কাসেরেসের হেডটি উড়ে গিয়ে সেভ করেছেন।

তিনি যদি সেই গোলটি না ঠেকাতেন তবে ফল ভিন্ন হতে পারতো। হুগো লরিস এখন পর্যন্ত ৫ ম্যাচের মধ্যে ৩ ম্যাচে কোনো গোল হজম করেননি। তার দল সেমিফাইনালে উঠে গেছে, তার সামনে সুযোগ রয়েছে দারুণ কিছু করার। সেটি করতে পারলে ‘গোল্ডেন গ্লাভস’ তার হাতে উঠতে পারে।

ক্যাসপার স্মাইকেল (ডেনমার্ক) রাশিয়া বিশ্বকাপে দুই গোলরক্ষকের তুমুল লড়াই দেখেছে দ্বিতীয় পর্বে ডেনমার্ক বনাম ক্রোয়েশিয়া ম্যাচে। ডেনিশ গোলরক্ষক ক্যাসপার স্মাইকেল এবং ক্রোয়েশিয়ার গোলরক্ষক ড্যানিয়েল সুবাসিচ উপভোগ্য এক ম্যাচ উপহার দিয়েছিলেন। সেই ম্যাচে স্মাইকেল মোট ৩টি পেনাল্টি আটকে দেন। অতিরিক্ত সময়ে পেনাল্টি পায় ক্রোয়েশিয়া সেটি আটকে ম্যাচ নিয়ে টাইব্রেকারে। সেখানেও স্মাইকেল দারুণভাবে দুটি শট আটকে দেন। কিন্তু সুবাসিচ টাইব্রেকারে ৩টি শট আটকে জয় ছিনিয়ে নেন। এছাড়া গ্রুপ পর্বে ডেনিশ গোলরক্ষককে পরাস্ত করতে পারেনি শক্তিশালী ফ্রান্স এবং পেরুর ফরোয়ার্ডরা।

চার ম্যাচের দুই ম্যাচে তিনি কোনো গোল হজম করেননি এবং তিনটি পেনাল্টি শট আটকে নায়ক হলেও দল জিততে না পারায় তার কৃতিত্ব ঢাকা পড়ে যায়। গোল্ডেন গ্লাভস জয়ের দৌড়ে তিনি হয়তো থাকবেন কিন্তু তার দল ডেনমার্ক দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে বিদায় নেয়ায় তার এই পুরস্কার জয়ের সম্ভাবনা কিছুটা ক্ষীণ।

এএ/জেএইচ