ঢাকা, বুধবার, ০৪ আগস্ট ২০২১, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে ভেষজ উদ্ভিদ স্টিভিয়া

https://www.dhakatimes24.com/2021/07/18/222601/ডায়াবেটিস-নিয়ন্ত্রণে-ভেষজ-উদ্ভিদ-স্টিভিয়া
BYফিচার ডেস্ক, ঢাকাটাইমস

দুর্বল রুটিন, অনুপযুক্ত ডায়েট এবং ভুল ডায়েটের কারণে অনেক রোগের জন্ম হয় যার মধ্যে একটি হল ডায়াবেটিস। এই রোগ রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির কারণে ঘটে। একই সময়ে, অগ্ন্যাশয় ইনসুলিন নিঃসরণ বন্ধ হয়ে যায়। এর জন্য ওষুধ এড়ানো প্রয়োজন। একই সাথে, খাদ্যাভ্যাসের দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া উচিত্‍। আপনি যদি ডায়াবেটিস রোগীও হন এবং রক্তে শর্করাকে নিয়ন্ত্রণ করতে চান, তাই স্টিভিয়া সেবন করা যায়। বেশ কয়েকটি গবেষণায় জানা গেছে যে স্টেভিয়া হল ডায়াবেটিসের নিরামাহীন রোগ।

স্টিভিয়া বহু বর্ষজীবী গুল্মজাতীয় একটি উদ্ভিদ। এর পাতা ও কাণ্ড প্রচণ্ড মিষ্টি। স্টিভিয়া সর্বোচ্চ ৬০-৭০ সেন্টিমিটার উচ্চতা বিশিষ্ট হয়। সবুজ রঙের পাতাগুলো কান্ডের সাথে বিপরীতমুখী বিন্যাসে থাকে এবং পাতার কিনারা খাঁজ কাটা ও বর্শাকৃতির। উদ্ভিদটি অনেকটাই এ্যাস্টার ফুল গাছের মতো। এর ফুল ছোট ও সাদা রঙের এবং কীটপতঙ্গ দ্বারা পরাগায়িত। বীজ এন্ডোস্পারম যুক্ত ক্ষুদ্রাকৃতির। স্টিভিয়া সাধারণত রৌদ্র পছন্দের এবং ছোট দিনের উদ্ভিদ। তবে রৌদ্র পছন্দের হলেও দিনের ভাগ ১৩ ঘণ্টার বেশি অপছন্দনীয়। স্টিভিয়া গাছটির সবুজ পাতাই মূলত কার্যকরী মিষ্টি উপাদানের প্রধান উৎস।

উদ্ভিদ বিজ্ঞানীরা বলছেন, এক টেবিল চামচ চিনির তুলনায় স্টিভিয়ার কয়েকটি পাতার মিষ্টতা ৩০ থেকে ১৫০ গুণ বেশি। ফলে সহজেই এটিকে চিনির বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায়। স্পেনের বিখ্যাত উদ্ভিদ বিজ্ঞানী ও ইউনিভার্সিটি অব ভ্যালেন্সিয়ার বোটানির অধ্যাপক পেট্রাস জ্যাকোবাস স্টিভাসের নামানুসারে এটির নাম রাখা হয়েছে স্টিভিয়া।

স্টিভিয়া প্রাকৃতিক মিষ্টান্নকারীদের জন্য বিশ্বের অনেক দেশেই ব্যবহৃত হয়। এটি স্টেভিয়া উদ্ভিদ নামেও পরিচিত। লোকেরা কথোপকথনে এটাকে মিষ্টি পাতা বলে। রক্তে শর্করার স্তর নিয়ন্ত্রণ এটি ব্যবহার করে গ্রহণ করা হয়। ২০১১ সালের এক গবেষণা অনুসারে স্টেভিয়ার অ্যান্টি-ডায়াবেটিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এতে ক্ষতি করা বিটা কোষগুলোকে পুনর্জীবিত করার বৈশিষ্ট্যও রয়েছে। রক্তের সুগার নিয়ন্ত্রণে স্টিভিয়া অত্যন্ত উপকারী।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্টিভিয়ার পাতার গুঁড়ো নিয়মিত সেবনে মানবদেহে কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। পরের বছর আরেকটি গবেষণা প্রমাণ করে যে রক্তে ইনসুলিন ও গ্লুকোজের পরিমাণ ঠিক রাখতে এটি বেশ সহায়ক। ফলে ডায়াবেটিস আক্রান্তদের রক্তে সুগারের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে স্টিভিয়া। একই সঙ্গে এতে ন্যূনতম মাত্রায় ক্যালরি রয়েছে। ফলে যারা ডায়েট করেন কিংবা ওজন কমাতে চান, তাদের জন্য চিনির সবচেয়ে কার্যকর বিকল্প হতে পারে স্টিভিয়া।

বিশেষজ্ঞদের মতে, স্টিভিয়ার গুঁড়া প্রতিদিন গ্রহণ করলে ডায়াবেটিসে খুব তাড়াতাড়ি মুক্তি পাওয়া যায়। এর জন্য এক গ্লাস পানিতে বা দুধে আধা গ্রাম স্টেভিয়া মিশিয়ে প্রতিদিন এটি গ্রহণ করুন। এটি রক্তে ডায়বেটিসের পরিমাণ বাড়ায় না। ডায়বেটিসের চেয়ে ২০ গুণ বেশি মিষ্টি দেয়। এটি অন্যান্য অনেক রোগ নির্মূল করতে সক্ষম।

এ ছাড়াও দাঁতে ব্যাকটেরিয়াজনিত ও ক্ষয়রোধে স্টিভিয়া যেমন অ্যান্টিবায়োটিক হিসেবে কাজ করে তেমনি পাকস্থলিতে হজমে সহায়তা করে। যকৃত, অগ্ন্যাশয় ও প্লীহায় পুষ্টি সরবরাহ করে এবং ত্বকের নিরাময় করে।

ইউরোপিয়ান ফুড সেফটি অথরিটি (ইএফএসএ) স্টিভিয়াকে নিরাপদ ঘোষণা করেছে। এ কারণে ইউরোপ, আমেরিকায় চিনির বিকল্প হিসেবে স্টিভিয়ার তরল কিংবা গুঁড়ো দিয়ে তৈরি চা, কফি, স্মুদি, দই, কোমল পানীয় জনপ্রিয়তা পেয়েছে। স্টিভিয়া গ্রিস, ব্রাজিল, প্যারাগুয়ের মতো গ্রীষ্মমণ্ডলীয় দেশগুলোয় ভালো জন্মায়। এসব দেশের ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুর সঙ্গে বাংলাদেশের অনেকটাই মিল রয়েছে। এ কারণে আমাদের দেশে স্টিভিয়া চাষ লাভজনক হতে পারে।

জৈব সারযুক্ত ও নিষ্কাশনযুক্ত দো-আঁশ মাটি এবং সাধারণত ১৫-৩০ সেলিসিয়াস তাপমাত্রা স্টিভিয়া চাষের জন্য খুবই উপযোগী। এ কারণে আমাদের দেশে প্রায় সারা বছরই মাঠ ফসল হিসেবে স্টিভিয়ার চাষ করা যায়। বাড়ির বারান্দায় রৌদ্রযুক্ত স্থানে কিংবা বাড়ির ছাদে ৫-৬ ইঞ্চি টবে কিংবা পলিথিনে চারা রোপণের মাধ্যমে ইতোমধ্যে স্টিভিয়ার চাষ ব্যাপকতা লাভ করেছে। মাঠ ফসল হিসেবে স্টিভিয়ার চাষ এত লাভজনক যে একজন চাষি প্রতি বছর বিঘাপ্রতি কয়েক লাখ টাকা অনায়াসে আয় করতে পারেন। আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে গাছটি চাষ করে ইতোমধ্যে একরপ্রতি ২.০-২.৫ লাখ রুপি মুনাফা অর্জন করছে।

স্টিভিয়ার পাতা গুঁড়া করে পাউডার, ট্যাবলেট কিংবা তরল প্যাকেজে বাজারজাত করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, এক কেজি কাঁচা পাতা শুকিয়ে প্রায় ২০০-৩০০ গ্রাম পাউডার পাওয়া যেতে পারে। এসব তরল কিংবা পাউডার অথবা স্টিভিয়া হতে উৎপাদিত চিনি পাউরুটি এবং বিস্কুট তৈরির কারখানাগুলোতে ডায়াবেটিস ও ব্লাডপ্রেসার রোগীদের জন্য বিশেষ রুটি ও বিস্কুট তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক।

যাদের ডায়াবেটিস কিংবা ব্লাড প্রেসার আছে তারা নিজ বসতবাড়িতে মাত্র দু-একটি টবে বহু বর্ষজীবী এ গাছ যত্ন সহকারে চাষ করলে পরিবারে চিনির চাহিদা পূরণ করা কোনো ব্যাপারই নয়। প্রতি ১ কেজি খাবার মিষ্টিকরণের জন্য মাত্র ৭.৯ মিলিগ্রাম স্টিভিয়া যথেষ্ট। এক গ্লাস পানিতে ১-২টি কাঁচা পাতার রস মিশিয়ে দিলেও অনেক মিষ্টি পাওয়া যায়। তাই সরবত, চা, কফি, সেমাই এবং অন্যান্য পানীয় দ্রব্যে ব্যবহার্য মিষ্টি উপাদান হিসেবে স্টিভিয়া ব্যবহার করা যেতে পারে।

(ঢাকাটাইমস/১৮জুলাই/আরজেড)