ঢাকা, বুধবার, ০৪ আগস্ট ২০২১, ২০ শ্রাবণ ১৪২৭

বিষাদময় সময়ে আরেকটি ঈদ পার

http://bangla.bdnews24.com/bangladesh/article1917182.bdnews
BYনিজস্ব প্রতিবেদক    বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published: 22 Jul 2021 01:19 AM BdST Updated: 22 Jul 2021 08:42 AM BdST

সামর্থ্য অনুযায়ী কোরবানি দিলেও তাতে যেন ছিল বিধিনিষেধের ছায়া; ঈদ জামাত আর ঘোরাঘুরিতে ছিল স্বাস্থ্যবিধির চাপ।

সরকারি নির্দেশনায় বড় বড় ঈদগাহের বদলে মসজিদে মসজিদে হয়েছে ঈদের নামাজ, সংকট আর মহামারী মুক্তির প্রার্থনা মোনাজাত করেছেন মানুষ।

মহামারীর মধ্যে আসা চতুর্থ ঈদের দিনে খবর এল মারণঘাতি ভাইরাসের সংক্রমণে আরও ১৭৩ জনের মৃত্যুর, কম নমুনা পরীক্ষার মধ্যে নতুন করে আক্রান্ত হয়েছেন আরও ৭ হাজার ৬১৪ জন।

গত কিছু দিন ধরে প্রতিদিন দুই শতাধিক মৃত্যু আর ১১ হাজারের বেশি আক্রান্ত হওয়ায় ঈদের খুশিতে যেন স্বাস্থ্যবিধি না হারায়, সেই আহ্বানই আসছে বারবার। যদিও তা উপেক্ষিত দেখা গেছে ঈদের বাড়ি ফেরা এবং কোরবানির হাটের ভিড়ে।

ফলে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ উপেক্ষা করে মহামারীর দ্বিতীয় ঢেউয়ে বিপর্যস্ত অবস্থার মধ্যে বিধি-নিষেধ থেকে মুক্তির সুযোগ যেভাবে মানুষ নিয়েছে, তাতে ঈদের পরে সংক্রমণ পরিস্থিতি কী দাঁড়ায়, তা নিয়ে শঙ্কা থেকেই যায়।

পরিস্থিতি কতটা ভয়ঙ্কর হতে পারে- সে ইঙ্গিত দিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল নাজমুল হক বলেন, “আমার ভয় লাগে যে, ইন্দোনেশিয়া-ভারত এ পর্যায়ে না আমরা না পৌঁছাই। অগাস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে গিয়ে প্রতিদিন ৮০০ থেকে ১০০০ মৃত্যু হবে না- এটা বলা যাচ্ছে না। আমরা এটা বলতেও ভয় পাচ্ছি। কিন্তু মনে হচ্ছে এটাই হবে।”

করোনাভাইরাসের টিকাদান কর্মসূচি সফল করতে সরকারের পাশাপাশি দলমত নির্বিশেষে সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ।

বঙ্গভবনের হলওয়ে বুধবার সকালে কোরবানির ঈদের জামাত শেষে মোনাজাতে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ছবি: প্রেস উইং,বঙ্গভবন

বুধবার ঈদের সকালে বঙ্গভবন থেকে দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এক শুভেচ্ছা বার্তায় তিনি বলেন, “রাতের আঁধার শেষেই ঝলমলে রোদের আলোতে ভরে উঠে পৃথিবী। করোনার অমানিশার আঁধারও সহসাই কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ। নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এগিয়ে যাবে আমাদের দেশ।“

মহামারীর অন্ধকার কাটাতে যথাযথভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কথা দেশবাসীকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন রাষ্ট্রপ্রধান।

সকাল ৭টায় রাজধানীর বায়তুল মোকাররম মসজিদে অনুষ্ঠিত হয় দেশের প্রধান ঈদ জামাত। এরপর সেখানে আরও চারটি ঈদ জামাত হয়েছে।

পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পল্টন এলাকা থেকে ঈদের নামাজ পড়তে আসেন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা জামাল উদ্দিন।

মহামারীমুক্তির জন্য প্রার্থনা করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, “করোনা থেকে মুক্তি চাই আল্লাহর কাছে। পুরো পৃথিবীটাই বিষাদের মধ্যে পড়ে আছে, সবাই অশান্তির মধ্যে পড়ে আছে— এটা থেকে আল্লাহর কাছে মুক্তি চাই।”

এমনিতে করোনাভাইরাসের কারণে সরকারি নির্দেশনায় ঢাকার পার্ক, চিড়িয়াখানা, শিশুমেলা ও সিনেমা হল বন্ধ আছে।

হাতিরঝিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডি রবীন্দ্র সরোবরের মতো উন্মুক্ত স্থানেও ভিড় স্বাভাবিক সময়ের মতো দেখা যায়নি।

ছবি: মাহমুদ জামান অভি

রবীন্দ্র সরোবর এলাকায় আনন্দের খোঁজে বের হওয়ার তালিকায় দেখা গেল মরিয়ম, মুন্নী ও দিনাকে। বৃষ্টিস্নাত ভরদুপুরে ফাঁকা ঢাকায় অনেকটা নির্জন ধানমণ্ডি লেকের পাশে বসে তিন শিশু বসে গ্ল্প করছিল। হালকা খাবারও খাচ্ছিল।

ঈদের রঙিন জামায় তিনজনের চোখে মুখে ছিল আনন্দের ছটা; সঙ্গে উদ্বেগও ছিল, মুক্ত হাওয়ায় বেড়ানোর সময় বুঝি বা ফুরিয়ে যায়।

কাছে গিয়ে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করতেই একজন আরেকজনের নাম জানিয়ে দিল। তারা তিনজনই একই স্কুলে পড়ে, তৃতীয় শ্রেণীতে।

মরিয়ম বলেন, “আজ তো ঈদ। তাই সকাল সকাল আমরা ঘুরতে বেরিয়েছি। আমার মা এসেছে আমাদের সঙ্গে। একটু দূরে রয়েছে, ওই দিকে।”

ছবি তোলার চেষ্টা করতেই লজ্জা পেয়ে যায় তিনজনই; মুখও ঘুরিয়ে নেয়।

“আমরা বেড়াতে এসেছি। আজ খুব ভালো লেগেছে। রাস্তা ফাঁকা, এখানেও ফাঁকা। তিনজনে দৌড়াদৌড়ি করেছি,” বলে দিনা।

স্বাভাবিক সময়ের ঈদের হাতিরঝিল এলাকায় মানুষের উপচেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেলেও এবার উপস্থিতি তেমন মনে হয়নি।

ঈদের দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছিন্নমূল মানুষদের মাঝে খাবার বিতরণ করেন ডাকসুর সাবেক সদস্য তানভীর হাসান সৈকত ও তার বন্ধুরা। সেখানে শত শত মানুষকে লাইন ধরে খাবার নিতে দেখা গেছে।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোবরানি গোস্তের হাটও ছিল বেশ জমজমাট; মানুষের বাড়ি থেকে পাওয়া মাংস বিক্রি করতে দেখা যায় কসাই ও দরিদ্র মানুষদের। ‘দিন আনে দিন খায়’ ও ‘দিনমজুর’ ধরনের একেবারে নিম্ন আয়ের মানুষই এই হাটের মূল ক্রেতা।

শেষ বাজারে দাম কম পড়ায় অনেক কসাই গরু কিনে ঈদের বিভিন্ন এলাকায় জবাই করে বিক্রি করেছেন। মোহাম্মদিয়া হাউজিং এলাকায় একজন বিক্রেতাকে ওই মাংসের দাম ৬০০ টাকা করে হাঁকাতে দেখা গেছে।

ঈদের দু’দিন পর শুক্রবার থেকে কঠোর বিধিনিষেধের ঘোষণা ইতোমধ্যে দিয়ে রেখেছে সরকার। ঘোষণা ঠিক থাকলে ঈদ করতে যারা বাড়ি গিয়েছেন, তাদের ফিরতে হবে বৃহস্পতিবারের মধ্যে।

ফলে ফিরতি যাত্রায় ঝক্কির কথা চিন্তা করে কেউ কেউ ঈদের দিনই ঢাকার পথ ধরেছেন।

এমনই একজন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী সাখাওয়াত হোসেন, যিনি নোয়াখালী থেকে ঢাকার পথ ধরেছেন বুধবার সন্ধ্যায়ই।

একটি তথ্য প্রযুক্তি কোম্পানির এই কর্মী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বাড়ি না আসলেই নয়, সে কারণে এসেছি। কালকে রাস্তাঘাট কেমন থাকে জানি না, এজন্য আজই ঢাকায় রওনা করেছি।”

আরও খবরঅমানিশার আঁধার কাটবেই: রাষ্ট্রপতিঈদের জামাতে মহামারীমুক্তির মোনাজাতনিরানন্দের ঈদে আনন্দের খোঁজেসেই যত্রতত্র পশু জবাই